ঝিনাইদহে হরিণাকুন্ডুতে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের অধীনে কাজ না করেই কোটি কোটি টাকা লুট করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আজিজুর রহমান। ঘটনা ধামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন তিনি।
শ্রমিক দিয়ে কাজ করার কথা থাকলেও শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু (মাটি কাটার যন্ত্র) ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়বৃদ্ধির জন্য গৃহীত এসব প্রকল্প দারিদ্র্যবিমোচনে কোনো উপকারে আসেনি।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প অনুমোদনের আগেই ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমদিকে উপজেলার কাপাশহাটিয়া ও ভায়না ইউনিয়নের রাস্তায় মাটি ভরাটের
কাজ শেষ করা হয়েছে।
এ উপজেলায় টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, হরিণাকুন্ডু উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে ও ১টি পৌরসভায় ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) কর্মসূচির আওতায় ১৭টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের জন্য ১ কোটি ৭ লাখ ৩০ হাজার ২৫৬ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাবিটা ৩য় ধাপে ৫৩ লাখ ৬৫ হাজার ১২৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাবিটার নয়টি প্রকল্পে ৭৬ দশমিক ৬৪ মেট্রিক টন গম ও ৩০ দশমিক ৬৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
টিআর (টেস্ট রিলিফ) কর্মসূচির আওতায় ৩৯টি প্রকল্পের অধীন প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ৯৭ লাখ ৪১ হাজার ১১৯ টাকা এবং ৩য় ধাপে ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৫৫৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পৌরসভায় বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৪ লাখ ৯৭ হাজার ১২৭ টাকা।
ঝিনাইদহ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ দপ্তর থেকে এ তথ্য জানা গেছে, জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ আব্দুল আওয়ালের সভাপতিত্বে চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কর্ণধার কমিটির সভায় প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়।
এ উপজেলায় টিআর, কাবিখা এবং কাবিটা প্রকল্পে ৩ কোটি ৩২ লাখ ৪ হাজার ১৯২ টাকা এবং ১০৭ দশমিক ২৯ মেট্রিক টন চাল ও গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। হরিণাকুন্ডু উপজেলার ৮ টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় অস্তিত্বহীন প্রকল্প দিয়ে সরকারি এ অর্থ লুটপাট করা হয়েছে।
উপজেলার ভায়না ইউনিয়নের তৈলটুপি মিঠুনের বাড়ি হতে ইমানের জমি পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা উন্নয়নে বরাদ্দ ৩ লাখ ৯০ হাজার, বাকচুয়া দক্ষিণপাড়া ব্রিজ থেকে খবিরের বাড়ি অভিমুখে রাস্তা মাটি দ্বারা উন্নয়ন ও ম্যাকাডম করনে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৬৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া ওই ইউনিয়নে তিনটি কাবিটা প্রকল্পে ১১ লক্ষাধিক টাকা, টিআর পাঁচটি প্রকল্পে ২০ লক্ষাধিক টাকা এবং ৮ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্ব স্ব প্রকল্পের সভাপতি (পিআইসি) নামমাত্র কাজ করেই বিল তুলে টাকা মেরে খেয়েছেন।
জোড়াদহ ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গাঙলির বিলের কাবিল মোল্লার জমি থেকে জাকেবের জমি অভিমুখে রাস্তা মাটি দ্বারা উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬৪ টাকা। এ ইউনিয়নে একাধিক প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করে লাখ লাখ টাকা লুটপাট করা হয়েছে।
তাহেরহুদা ইউনিয়নের তাহেরহুদা গ্রামে মন্ডলপাড়া মাহাবুলের বাড়ির সামনে হতে ছোট ক্যানেল হয়ে ব্রিজ অভিমুখে রাস্তা মাটি দ্বারা উন্নয়ন ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা, শ্রীপুর গ্রামের পাকড়াতালার মাঠ নারায়ণকান্দি অভিমুখে রাস্তা মাটি দ্বারা উন্নয়নে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং নারায়ণকান্দি বালে পাড়া মসজিদের সামনে থেকে পূর্বদিকে শ্রীপুর ব্রিজ অভিমুখে রাস্তা উন্নয়নে ৮ মেট্রিকটন গম বরাদ্দ দেয়া হলেও এসব প্রকল্পে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নে রামচন্দ্রপুর আবু বকর জমি হতে গোপালনগর বিলের অভিমুখে রাস্তা মাটি দ্বারা পুনর্নির্মাণে বরাদ্দ ১১ লাখ ৫৪ হাজার ৫৭৫ টাকা, সোনাতনপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে পাকা রাস্তা হতে খালের অভিমুখে রাস্তা পুনর্নির্মাণে বরাদ্দ ছিল ৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, কেষ্টপুর চরের মাঠে আমতলা হতে ব্রিজের অভিমুখে রাস্তা পুনর্নির্মাণ বরাদ্দ ছিল ৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং দৌলতপুর ব্রিজ হতে দুবলোকুড়ির মাঠের অভিমুখে রাস্তা পুনর্নির্মাণে ৮ দশমিক ৩০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ ছিল। এসব প্রকল্পে কাজ না করেই প্রকল্প সভাপতির (পিআইসি) নামে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ অন্তত ১১টি প্রকল্পে আংশিক কাজ দেখিয়ে এবং আরও ৫টির অধিক প্রকল্পে একেবারেই কোনো কাজ না করেই বিল উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ করা ৪০ দিনের কর্মসূচিতে তালিকাভুক্ত ২৩৭ জন শ্রমিকের নামে প্রায় ৭০ লাখ টাকা কাজের নামে আত্মসাৎ করা হয়েছে, যা সরকারি অর্থ লুটের এক জঘন্য দৃষ্টান্ত।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কোথাও সামান্য ধুলো মাটি ফেলে দায়সারা ভাবে কাজ করা হয়েছে, আবার কোথাও কোনো কাজই হয়নি। ছয় ইঞ্চি রাস্তা করার কথা থাকলেও মাত্র তিন ইঞ্চি করে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। একই রাস্তা একাধিক প্রকল্পে দেখিয়ে একাধিকবার বিল তোলার প্রমাণও পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রামচন্দ্রপুর, দখলপুর, সোনাতনপুর, দৌলতপুর, কেষ্টপুর, মৃগীবাথান, গোবরাপাড়া ও রিশখালীসহ ইউনিয়নের অন্তত ১৫টির অধিক প্রকল্পে কাজ না করেই নগদ অর্থ তোলা হয়েছে।
মৃগীবাথান গ্রামের রায়হান উদ্দিন বলেন, আমরা নিজেরা রাবিশ ফেলে রাস্তা ঠিক করেছি। পরে শুনি চেয়ারম্যান ওই রাস্তায় সরকারি প্রকল্প দেখিয়ে বিল তুলে নিয়েছেন।
ওই এলাকার রাজন আলী জানান, তারা কোনো প্রকল্পের ব্যাপারে জানতেন না। কাগজপত্র দেখে জানতে পেরেছেন প্রকল্পের টাকা চেয়ারম্যান সব তুলে নিয়েছেন। বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি প্রভাষক আনিসুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, চেয়ারম্যান সরকারি অর্থ লুটপাট করেছেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে চেয়ারম্যান ওই ইউনিয়নে কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন। সাময়িক নয় তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে জেল-জরিমানার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
কাপাশহাটিয়া ইউনিয়নের শিতলী মাঠের ভেতর এইচবিবি রাস্তা হতে ইদ্রিস আলীর জমি পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা পুনর্নির্মাণে ১৫ দশমিক ৩০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর কথা থাকলেও বাইরে থেকে কিছু মাটি এনে প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সেখানে কাজের কাজ কিছুই করা হয়নি। শিতলী মাঠের ভেতর ফটিক আলী জোয়ার্দ্দারের জমি থেকে বিশারতের জমি পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা পুনঃনির্মাণে টিআর প্রকল্পে ৩ লক্ষ ৬৮ হাজার ২২৪ টাকা এবং শিতলী গ্রামের এইচবিবি রাস্তার মাথা হতে খালের মাথা পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণ ও উন্নয়নে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, কিসমত ঘোড়াগাছা মিনারের বাড়ি মেইন রাস্তা হতে বিলের মাঠ অভিমুখে রাস্তা মাটি ভরাট ও মেকাডাম করন ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও নাম মাত্র কাজ দেখিয়ে এসব বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
এ ছাড়া কাপাশহাটিয়া ইউনিয়নের শাখারীদহ আলতাফের বাড়ি থেকে খলিশাকুড়ো বিলের অভিমুখে ভাগাড়ের (সরকারের খাসজমি) কিনারা থেকে মাটি নিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। এ প্রকল্পে রাস্তায় মাটি ভরাট বাবদ ১৩ লাখ ৪৭ হাজার ৭২০ টাকা (কাবিটা) এবং ১০টি টিআর প্রকল্পে আনুমানিক ২৫ লাখ টাকা এবং ৯ দশমিক ৬০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়।
কাপাশাটিয়া গ্রামের শফি উদ্দিন খবরের কাগজকে জানান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা দাঁড়িয়ে থেকে ভেকু দিয়ে ভাগাড়ের মাটি ভাগাড়েই দিয়েছেন।
ওই এলাকার রিজিয়া খাতুন জানান, শ্রমিক দিয়ে মাটি কাটার কথা থাকলেও ভেকু দিয়ে রাস্তার মাটি রাস্তায় দেওয়া হয়েছে।
সাইফুল ইসলাম জানান, সরকারি টাকা চেয়ারম্যান-মেম্বাররা মেরে খাওয়ার জন্য নামমাত্র কাজ করেছেন। ফলসি বোয়ালিয়া বিশ্বাস বাড়ি কবরস্থান থেকে চেয়ারম্যান বাড়ি পর্যন্ত পুকুরের দুই পাড়ের রাস্তা মাটি দ্বারা উন্নয়ন ও সংস্কার ২৯৪০০০ রঘুনাথপুর ইউনিয়নের মন্ডলতোলা কুমরোল এবং নতুন ব্রিজ হতে ডা. ওহাবের মাদ্রাসা পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা সংস্কারে ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৫১ টাকা, চর আড়ুয়াকান্দি ভিটের মাঠ মকছেদের বাড়ির পাশের মসজিদ হতে নজরুলের বাড়ি রাধানগর অভিমুখে রাস্তা মাটি দ্বারা সংস্কারে ৭ লাখ টাকা, পোড়াহাটি আব্দুর রশিদের বাড়ি হতে জামালের বাড়ি অভিমুখে মাটি দ্বারা রাস্তা উন্নয়ন ২ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং কালাপাডিয়া টি-২০ খাল থেকে জোড়াপুকুর মাঠ অভিমুখে রাস্তায় মাটি ভরাট বাবদ ২ লাখ টাকা ছাড়াও একাধিক প্রকল্পে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
রঘুনাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বশির উদ্দিন এসব প্রকল্পে কাজ করা হয়েছে বলে জানান।
উপজেলায় কয়েকটি প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করা হয়েছে। ২০২৪- ২০২৫ অর্থবছরের কাজ জুলাই-আগস্ট মাসে করতে দেখা গেছে। আবার কিছু প্রকল্পে একেবারেই কাজ করা হয়নি। প্রকল্প এলাকায় সাইনবোর্ড থাকার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। লুটপাট করার জন্যই এমনটি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ তদারকি না করেই গত ২৬ জুন সমুদয় বিল ছাড় করেছেন।
দেখা গেছে, সামান্য মাটি কাটার কাজ করে পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে এবং সরকারি অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সরকারি অর্থ অপচয় এবং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে। এতে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে এবং জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
হরিণাকুন্ডু উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আজিজুর রহমান খবরের কাগজকে জানান, চেয়ারম্যান ও প্রকল্পের সভাপতিরা (পিআইসি) বৃষ্টির অজুহাত দেখিয়ে কাজ করেননি।
তিনি আরও বলেন, টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের কাজ সারাদেশে যেভাবে হয়ে থাকে হরিণাকুন্ডু উপজেলায়ও সেভাবেই হয়েছে। উপজেলার যেসব প্রকল্পে কাজ হয়নি সেসব প্রকল্পে সভাপতির (পিআইসি) মাধ্যমে কাজ করানো হচ্ছে। কাজ না করেই ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে এ বিষয়ে তিনি বলেন কাজ না করলে সরকারি অর্থ ফেরত দিতে হবে।
এ বিষয়ে হরিণাকুন্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বি এম তারিক-উজ-জামান বলেন, আমার কাছে অভিযোগ এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
স্থানীয়রা অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে যথাযথ তদন্ত এবং কাজ না করেই সরকারি অর্থ লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মাহফুজুর/মেহেদী/