জীবনের শুরুটা সহজ ছিল না। জন্মের পর থেকেই তার ডান পা হাঁটুর নিচ পর্যন্ত। হাঁটতে পারতেন না, খেলাধুলা করা ছিল কষ্টকর। কিন্তু চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার পৌর সদরের দক্ষিণ গোবিন্দারখিল এলাকার তরুণ জুবাইর জিসান শিখেছিলেন একটাই শিক্ষা। জীবন থেমে থাকে না। সীমাবদ্ধতা নয়, সাহস ও আত্মবিশ্বাসই পারে জীবনের পথে এগিয়ে নিতে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে মাধ্যমিক পাস করেছেন কৃতিত্বের সঙ্গে।
সেই বিশ্বাস নিয়েই জুবাইর জিসান ২০২৫ সালের অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় পটিয়া সরকারি কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে অংশ নিয়ে জিপিএ ৩ দশমিক ১৭ পেয়েছেন। তার এই সাফল্য এক তরুণের অবিচল মানসিক শক্তি ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
স্থানীয়রা জানান, জন্মের পর থেকেই পরিবার বুঝতে পারে, জিসান অন্য শিশুদের মতো নয়। ডান পা হাঁটুর নিচে শেষ হয়ে গেছে। চলাফেরার জন্য প্রয়োজন কৃত্রিম পা। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এটি তখন সম্ভব ছিল না। ছোটবেলায় হেঁটে স্কুলে যাওয়া ছিল একরকম যুদ্ধের সমান। তবু পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ ছিল অটুট।
জিসান বলেন, ‘প্রতিদিন স্কুলে লাঠির সাহায্যে হেঁটে যেতাম। বৃষ্টির দিনে রাস্তায় পড়ে যেতাম, আবার উঠে দাঁড়াতাম। কিন্তু কখনো স্কুল মিস করিনি।’ তিনি জানান, তার স্বপ্ন একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়া। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি কম্পিউটার শেখার কাজও শুরু করেছে। ডিজিটাল মার্কেটিং ও গ্রাফিক্স ডিজাইনে আগ্রহী এই তরুণ ভবিষ্যতে প্রতিবন্ধী তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে চান।
এদিকে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবার তার জন্য একটি কৃত্রিম পা তৈরি করায়। সেই কৃত্রিম পা-ই হয়ে ওঠে তার জীবনের নতুন ভরসা। এখন তিনি নিজেই হাঁটেন, চলাফেরা করেন, এমনকি কলেজেও নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, জিসানের সাফল্যের পেছনে তার পরিবারের ভূমিকা অনেক। বাবা একজন কুলি, মা গৃহিণী। সীমিত আয়ে সংসার চললেও তারা ছেলের শিক্ষার বিষয়ে কখনো আপস করেননি।
জিসানের মা রোজিনা আকতার বলেন, ‘জিসান ছোট থেকেই দৃঢ় মনোবলের। কখনো দমে যায়নি। আমরা শুধু পাশে থেকেছি। আজ (বৃহস্পতিবার) তার ফল দেখে মনে হচ্ছে, ওর পরিশ্রম বৃথা যায়নি।’
বাবা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ওর (জিসান) কৃত্রিম পা লাগানোর সময় আমি খুব চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু সে নিজেই বলেছিল, আমি পারব, তুমি চিন্তা করো না। আজ ওর সাফল্য আমাদের গর্বিত করেছে।’
সহপাঠী তাশফিক আহমেদ বলেন, ‘জিসানের মুখে আমি কখনো হতাশার কথা শুনিনি। পরীক্ষার আগে সবাই নার্ভাস থাকত। কিন্তু ও বলত, চেষ্টা করলে সবই সম্ভব।’
পটিয়া সরকারি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষকরা বলেন, ‘জুবাইর সবসময় হাসিখুশি থাকত। শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কখনো নিজের অবস্থান নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেনি।’
পটিয়া সরকারি কলেজের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘জিসান আমাদের সবার অনুপ্রেরণা। প্রতিদিন ক্লাসে সময়মতো আসত, কোনো কাজ এড়িয়ে যেত না। ওর সাহস এবং ইতিবাচক মানসিকতা অন্যদের জন্য উদাহরণ।’
পটিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ফেরদৌস আলম বলেন, ‘আমাদের উচিত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রতি আরও সহনশীল ও সহায়ক হওয়া। জিসানের মতো শিক্ষার্থীরা দেখিয়ে দিচ্ছে, তারা যদি সুযোগ পায়, তাহলে দেশের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’