‘দক্ষিণ বাংলার অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কলেজ ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ। দেশের শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী কলেজগুলোর মধ্যে অন্যতম এটি। কলেজটি অতীত ঐতিহ্য থাকলেও বর্তমানে শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত।
অর্ধশত বছরে বেশি সময় ধরে চালু হওয়া অনার্স ও মাস্টার্সের নতুন নতুন বিভাগ যুক্ত হওয়ায় বেড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। কিন্তু ৩৭ বছর ধরে নতুন কোনো ছাত্রাবাস কিংবা ছাত্রীনিবাস নির্মাণ হয়নি। ফলে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থীদের থাকতে হচ্ছে ক্যাম্পাসের বাইরে। এতে পরিবহন, সিট ভাড়া, খাবার মিলে একজন শিক্ষার্থীর মাসে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে, যা অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই কষ্টসাধ্য।
বিএম কলেজ সূত্র জানায়, ৫৮ একর জমির ওপর নির্মিত ব্রজমোহন দক্ষিণাঞ্চলের সর্ব বৃহত্তর কলেজ। বড় ২২টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও ২১টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর উচ্চশিক্ষা চালু করেছে। বর্তমানে কলেজটিতে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে। বরিশালের ৬ জেলা ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য এই কলেজে পড়াশোনা করেন। কলেজের শিক্ষার্থীদের আবসনের জন্য রয়েছে মাত্র ৭টি হোস্টেল। এর মধ্যে ছাত্রাবাস ৪টি এবং ছাত্রীনিবাস ৩টি। ৭টির মধ্যে সুরেন্দ্র ভবন ও দেবেন্দ্র ভবন দুইটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে কয়েক বছর আগে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত সার্জেন্ট ফজলুল হক (মুসলিম) হলে ১৫০ বিপরীতে থাকেন ৩০০ জন। ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত মহাত্মা অশ্বিনী কুমার (ডিগ্রি) হলে ৩৫০ আসনের বিপরীতে থাকেন ৮০০ জন, ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কবি জীবনানন্দ দাশ (হিন্দু) হলে আসন সংখ্যা ১৫০ বিপরীতে থাকেন ২৫০ জন ছাত্র। অপর দিকে ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বনমালী গাঙ্গুলী মহিলা হোস্টেলে ৪০০ আসনের বিপরীতে থাকেন ৭৫০ জন, ১০ আসন বিশিষ্ট নৃপেন্দ্র ভবনে থাকেন ২০ জন শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীরা জানান, মহাত্মা অশ্বিনী কুমার (ডিগ্রি) হলে এ-ব্লক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময়ে সেখানে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেটা জেনেও এই ভবনে ২০০ জনের মতো শিক্ষার্থী থাকছেন। এ ছাড়া বহু বছর আগে সুরেন্দ্র ভবন ছাত্রাবাস ও দেবেন্দ্র ভবন ছাত্রীনিবাস দুইটি পরিত্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আবাসনসংকটের কারণে সুরেন্দ্র ভবনে ৪০ জন শিক্ষার্থী থাকছেন।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘আবাসিক হলে জায়গা না পেয়ে তারা মেস বা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, যা অতিরিক্ত খরচের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও পড়াশোনায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে।’
শিক্ষার্থী সাবরিনা শর্মী জানান, কলেজের ছাত্রীদের বৃহত্তর একটি অংশ নগরীর বিভিন্ন জায়গায় মেসে সিট ভাড়া নিয়ে থাকছে। এতে করে তারা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীদের মেসের সিট ভাড়া দ্বিগুণের বেশি। অনেক ছাত্র-ছাত্রী আছেন, যারা মেসের ভাড়া ও খাবার খরচ মেটাতে লেখাপড়ার ফাঁকে টিউশনি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শিক্ষার্থী সুজয় সরকার জানান, কলেজের নানা সমস্যা ও সংকট শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত করছে। কলেজের ৭টি হল নামমাত্র রয়েছে। এর অধিকাংশই বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কলেজ প্রশাসন আবাসনসংকট দূর করতে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন বলে আশা করেন তিনি।
বি এম কলেজ ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক খালেদ হোসেন বাবর বলেন, ‘আমাদের হলগুলো অনেক পুরোনো হওয়ায় অধিকাংশই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকছেন শিক্ষার্থীরা। একসময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিন্তু বর্তমানে ৬০ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হয়, নয়তো পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয় না। নিয়মিত ক্লাস করতে বরিশালের বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীদের শহরে থাকা বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীর মেসে থাকার সামর্থ্য নেই। আগামী সেশনে আরও নতুন সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হবে। সম্প্রতি কলেজের সব ছাত্রসংগঠন অধ্যক্ষের কাছে নতুন হল তৈরির দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান প্রকল্প দেখছি না।’
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. শেখ মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘কলেজটিতে আবাসনসংকট দীর্ঘদিনের। নতুন হল দরকার। পুরোনো হলগুলো সংস্কার দরকার। এ ব্যাপারে শিক্ষা প্রকৌশলী অধিদপ্তর বারবার আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় গিয়ে শিক্ষা প্রকৌশলী অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে দেখা করে সমস্যার কথা বলেছি। তিনিও আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না।’