স্মরণকালের ভয়াবহ বৃষ্টিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষিখাতে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। এক রাতেই ভারী বৃষ্টিতে জেলায় ৮৮৩৭ জন কৃষকের ৬১ কোটি ৮ লাখ ৪১ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এতে রোপা আমন ধানসহ ১০২২ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এসব ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭৩১৭.৬০০ মেট্রিক টন।
শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) এ ভয়াবহ বৃষ্টি হয়েছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জে।
বৃষ্টিপাতের পর এই ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৯৩৫ জন কৃষকের ৬৮ হেক্টর জমির রোপা আমন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৭০.১৬৮ লাখ টাকা। এই জমি থেকে উৎপাদন হতো ২৬১.৮০ মেট্রিক টন চাল।
১২৫ জন কৃষকের ১১ হেক্টর জমিতে আলুর ক্ষতি হয়েছে। এতে ওই কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫০.৮৭৫ লাখ টাকা। এ জমিতে আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২০৩.৫০ মেট্রিক টন।
৩২৭ হেক্টর জমিতে সরিষার ক্ষতি হয়েছে ২২৭০ জন কৃষকের। এতে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭০৬.৩২০ লাখ টাকা। এই জমিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫২৩.২০০ মেট্রিক টন সরিষা।
শাকসবজির ক্ষতি হয়েছে ৮৩ হেক্টর জমিতে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১২৭৫ জন কৃষক এবং টাকার অঙ্কে ক্ষতি হয়েছে ৬১৪.২০০ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত জমি থেকে শাকসবজি উৎপাদন হতো ১৫৩৫.৫০০ মেট্রিক টন।
৮৫২ জন কৃষকের ৮৭ হেক্টর জমির পেঁয়াজ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১১৭৪.৫০ লাখ টাকা। এ জমি থেকে পেঁয়াজের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৫৬৬.০০০ মেট্রিক টন।
৬৩০ জন কৃষকের ৭৭ হেক্টর জমির মাসকলাই নষ্ট হয়ে গেছে। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১২৫.১২৫ লাখ টাকা। এই জমি থেকে মাসকলাই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০০.১০০ মেট্রিক টন।
১৭০ জন কৃষকের ২৭ হেক্টর জমির ভুট্টা নষ্ট হয়েছে। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৯৯.২২৫ লাখ টাকা। এই জমিতে থেকে ভুট্টার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২৮৩.৫০ মেট্রিক টন।
৬০ জন কৃষকের ২৭ হেক্টর জমির স্ট্রবেরি নষ্ট হয়েছে। এতে কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে ৬৪৮.০০ লাখ টাকা। এই জমিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩২৪.০০০ মেট্রিক টন ভুট্টা।
এছাড়া ২৫২০ জন কৃষকের ৩১৫ হেক্টর জমির রসুন নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে ২৫২০.০০ লাখ টাকা। এই জমি থেকে রসুনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা বলছেন, একরাতের নজিরবিহীন বৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে ধান ও অন্যান্য ফসল। এসব ফসল চাষের জন্য বেশিরভাগ কৃষককেই কৃষি উপকরণের দোকানে অর্থ বাকী রাখতে হয়েছে। আবার কেউ কেউ বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন ঋণের টাকা শোধ করাও সম্ভব হবে না চাষীদের। ঋণ নিয়ে ধান চাষ করে ঋণের বোঝা আরও বেড়েছে তাদের।
দোকান থেকে বাকীতে সার-বীজসহ অন্যান্য উপকরণ নিয়ে এবার আমন ধান আবাদ করেছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার হোসেনডাইং এলাকার মনিরুল ইসলাম। কয়েকদিন পরেই শুরু করতেন ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ। কিন্তু বৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে সেই ধান। এখন লাভ তো দূরের কথা, দোকানের বাকী কিভাবে পরিশোধ করবেন সেই দুশ্চিন্তার ছাপ তার চোখে মুখে।
মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এবার আমন ধান চাষ করে ঋণের বোঝা আরও বেড়ে গেল আমাদের। দুই বিঘা জমিতে আমন চাষের সব উপকরণ বাকীতে কিনেছি। বৃষ্টিতে ক্ষতি হওয়ার পর যে ধান পাবো তা জমির মালিককেই দেওয়া যাবে না।’
মনিরুল ইসলাম অন্যের দুই বিঘা জমিতে রোপা আমন ধান আবাদ করেছিলেন। জমির মালিককে ধান দিতে হবে ১৬ মণ। অথচ বৃষ্টির পরে ধানগাছের যে অবস্থা, তাতে সবমিলিয়ে ২০ মণ ধান পাওয়া যাবে কি-না সন্দেহ আছে। ধান কাটার জন্য আবার শ্রমিককে পারিশ্রমিক দিতে হবে। এখন খেত থেকে পানি নেমে গেছে এতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতি।
শুধু মনিরুল ইসলামই নয়, তার মতো চাঁপাইনবাবগঞ্জের কয়েক হাজার কৃষকের এখন একই দুশ্চিন্তা। হোসেনডাইংয়ের আরেক চাষী আবু বকর বলেন, ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খাওয়ার জন্যও আমাদের ঋণ করতে হবে এখন। চাষাবাদের জন্য দোকানে বাকী তো আছেই। আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমি ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে চাষাবাদ করি। গত শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) যে বৃষ্টি হয়েছে এমন বৃষ্টি আর দেখিনি জীবনে।
আমন ধান চাষী রবিউল ইসলাম বলেন, আমার আট হাজার টাকা দোকানে বাকী আছে। এবার ধান তুলে এক টাকাও শোধ করতে পারবো না। আবার চাষাবাদের জন্য বাকীতে সার-বীজ ও কীটনাশক কিনতে হবে। এবারের ক্ষতির জের টানতে হবে পরের মৌসুমেও।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ইয়াছিন আলী বলেন, গত ৩১ অক্টোবর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত জেলায় গড়ে ১৯১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা গত ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং নজিরবিহীন। বৃষ্টিতে জেলার ৪৪৫৯ হেক্টর জমির রোপা আমনসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ৮৮৩৭ জন কৃষকের ১০২২ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনা হবে।
উল্লেখ্য, গত ৩১ অক্টোবর রাতভর স্মরণকালের ভয়াবহ বৃষ্টিতে পানিবন্দী হয়ে যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাবাসী। দুর্ভোগে পড়েন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নিচু এলাকার মানুষ। রাতভর বৃষ্টিতে ঘরে, দোকানে পানি ঢুকে পড়ে। রাস্তায় হাঁটু পর্যন্ত পানি উঠে যায়। কোথাও কোথাও কোমর ছুঁয়ে যায়। ভারী বৃষ্টিতে পুকুরের পানি উপচে পড়ে প্রায় কোটি টাকার মাছ ভেসে যায় বলে জেলা মৎস্য অফিস জানায়।
মো. আসাদুল্লাহ/নাঈম