মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জামশা ইউনিয়নের উত্তর জামশা আশ্রয়ণ প্রকল্পটি উদ্বোধনের সময় ছিল ভূমিহীন, বিধবা ও অসহায় মানুষের জীবনে আশার আলো। ২০০৩ সালে নির্মিত ৬০ পরিবারের এই আশ্রয়ণ এলাকায় তখন নেমেছিল উৎসবের আমেজ। কিন্তু দুই দশক পর বদলে গেছে দৃশ্যপট। নির্মাণের পর প্রকল্পের ঘরগুলো আর সংস্কার করা হয়নি। সংস্কার না হওয়ায় সেগুলো এখন জরাজীর্ণ, ভাঙাচোরা এবং বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ১৭ বছর সরকারের কাছে বারবার সংস্কারের আবেদন জানানো হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সাত থেকে আট বছর আগে প্রকল্পের ছয়টি প্লটে ৬০টি ঘরের মধ্যে অন্তত ১০টি ঘর আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি ঘরগুলোর চালা জং ধরা ও ফুটো, দরজা-জানালা ভাঙা, বেড়া ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় আট থেকে নয় বছর ধরে এ ঘরগুলো অযোগ্য অবস্থায় পড়ে থাকলেও বিকল্প থাকার জায়গা না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন ৩০ থেকে ৩৫ পরিবারের শতাধিক বাসিন্দা। গোসলখানা, টয়লেট ও টিউবওয়েল সবকিছুই অকার্যকর। বৃষ্টি হলেই ঘরে পানি ঢোকে, শীতে কাঁপতে হয় ঠাণ্ডায়। যাদের সামর্থ্য আছে তারা ঘরে কিছু টিন পরিবর্তন করলেও বেশির ভাগই জরাজীর্ণ ঘরেই বসবাস করছেন।
আশ্রয়ণের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী বিধবা শাহিদা বেগম। সামান্য আয়ের টাকা দিয়ে চলে তার সংসার। তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। এই ঘরই আমাদের একমাত্র ভরসা। টিনে মরিচা পড়ে জায়গায়-জায়গায় ছিদ্র হয়ে গেছে। বৃষ্টি নামলে ঘরে থাকা যায় না। তখন বালতি ধরে বসে থাকতে হয়। সংসারে আয় রোজগার কম থাকায় ঘর ঠিক করার মতো টাকাও নেই। আবারও শীত এসে গেছে। তাই এবারও কষ্ট করতে হবে।
অপর বাসিন্দা রেজিয়া বলেন, ‘আমি আমার তালাকপ্রাপ্ত মেয়ে আর নাতনির সঙ্গে ভাঙা ঘরে থাকি। আমার মেয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে। আগে আমিও কাজ করতাম কিন্তু বয়স হওয়াতে কাজ করতে পারি না। যেখানে মেয়ের আয় দিয়ে সংসার চালানোই কষ্টকর আর সেখানে ঘর ঠিক করব কীভাবে? সরকারের কাছে শুধু একটা আবেদন এই ঘরগুলো যদি একটু সংস্কার করে দিত, আমাদের জীবনটা একটু স্বাভাবিক হতো।’
শিক্ষার্থী খোকন বলে, ‘বৃষ্টির দিনে ঘরে পানি পড়ে বইখাতা ভিজে যায়। শীতের দিন কুয়াশা পড়ে। উপরের টিন, জানালা সব নষ্ট। পলিথিন ও বস্তা দিয়ে কোনো রকম ঠিক করছে। আমাদের এখানকার সব ঘরের অবস্থাই এমন। মনে হয় ঘরটা ভেঙে পড়বে। পড়ালেখা ঠিকমতো করা যায় না।’
সালমা নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘গোসলখানার দরজা ভাঙা, বস্তা টানিয়ে গোসল করতে হয়। খুব লজ্জা লাগে। এখানে যে টিউবয়েলগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরের জানালা-দরজা সব ভাঙা। ভয় আর কষ্ট নিয়েই বেঁচে আছি। কতবার চেয়ারম্যান-ইউএনওর অফিসে গেছি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। সরকার যদি একটু নজর দিত, তাহলে হয়তো ঠিক হতো।’
জামশা ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য আছমা আলেয়া বলেন, ‘আশ্রয়ণের ঘরগুলো অনেক আগে নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে ঘরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ ঘরগুলোর চাল, বেড়া ও দরজা-জানালা ভেঙে গেছে।
গোসলখানা, টয়লেট ও টিউবওয়েলগুলোরও বেহাল দশা। আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এটিকে দ্রুত সংস্কার করে বাসিন্দাদের বসবাসের উপযোগী করে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা জানান, ‘উত্তর জামশা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’