১০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে শেরপুর শহরে একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র (স্যানেটারি ল্যান্ডফিল বা ডাম্পিং স্টেশন) নির্মাণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল শহরের প্রতিদিনের বর্জ্য পরিবেশের ক্ষতি না করে নিরাপদ স্থানে ফেলা। অথচ পৌর এলাকার আবর্জনা সেখানে না ফেলে মৃগী নদীর পাশের একটি উন্মুক্ত জমিতে ফেলা হচ্ছে। বর্জ্যের পচা গন্ধে ওই এলাকায় বসবাস করা এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জমির দাম কমে গেছে। কেউ ওই এলাকায় আত্মীয়তা করতে চান না। এ ছাড়া ছড়িয়ে থাকা বর্জ্যের কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ইউজিআইআইপি-৩ প্রকল্পের আওতায় শহরের অষ্টমীতলা এলাকায় তিন একর জমি অধিগ্রহণ ও স্যানেটারি ল্যান্ডফিল স্থাপনে ব্যয় হয় সাড়ে ১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া শহরের মীরগঞ্জ-কালীগঞ্জ এলাকায় মৃগী নদীর পাশে ব্যক্তিমালিকানার এক একরের বেশি একটি জমি বছরে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে লিজ নেওয়া হয়। কথা ছিল শহরের আবর্জনা ফেলা হবে অষ্টমীতলার আধুনিক ল্যান্ডফিলে। অথচ সেখানে ‘মাঝেমধ্যে’ কিছু ময়লা ফেলে নিয়মিত আবর্জনা রাখা হয় মৃগী নদীর পাশের লিজ নেওয়া উন্মুক্ত জমিতে।
এলাকাবাসী জানান, পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে আবর্জনা সংগ্রহ শেষে গাড়িতে করে এনে নদী তীরে ফেলে যায়। এতে বাসা-বাড়ির আবর্জনার পাশাপাশি প্লাস্টিক ও মেডিকেল বর্জ্য নদীতে মিশে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে চলতে থাকায় নদীর পানি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। মাছসহ জলজপ্রাণী হারাচ্ছে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল।
শহরের কালীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম মিয়া বলেন, ‘মৃগী নদীর খুবই কাছে ময়লা ফেলা হয়। সব ময়লা নদীতে গিয়ে পড়ে। গন্ধের কারণে ভাগাড়ের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায় না। এই ময়লা পানিতেই কিশোর-কিশোরীরা গোসল করছে। অনেকে কাপড়, থালা-বাসন পরিষ্কার করছে।’
একই এলাকার বাসিন্দা লাল মিয়া বলেন, ‘আবর্জনা ফেলে নদীকে দূষিত করা হলো। এই পানি গরু-ছাগল-পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণী পান করে। আমরা তো গন্ধের কারণেই এখানে থাকতে পারি না। আবর্জনার কারণে এখানকার জমিও কেউ কিনতে চান না। এই এলাকায় কেউ আত্মীয়তা করতেও পিছুপা হন।’
মীরগঞ্জ এলাকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ময়লার গাড়ি সকাল, দুপুর, বিকেল, রাত- মোট চারবার আসে। প্রতিদিন গড়ে চার থেকে ছয়গাড়ি আবর্জনা ফেলা হয়। আমরা খুব কষ্টে আছি। এই রাস্তা দিয়ে হাঁটাও যায় না। আমরা চাই আবর্জনা অষ্টমীতলায় রাখুক। দুই জায়গা নষ্ট করার কোনো মানে আসে না। আমরা এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাই।’
অষ্টমীতলা এলাকার বাসিন্দা সেলিনা বেগম বলেন, ‘এখানে ময়লা কম ফেলে। কিন্তু সেগুলো সঠিক জায়গায় না রেখে রাস্তার পাশে ফেলা হয়। আবার মীরগঞ্জেও নাকি ফেলা হয়। এটা তো ঠিক না। সঠিকভাবে এক জায়গায় ফেললে তো কোনো সমস্যা হতো না।’
এ বিষয়ে উন্নয়নকর্মী সঞ্জীব কুমার দে বলেন, ‘সরকার কোটি টাকা খরচ করে ডাম্পিং স্টেশন বানিয়েছে। কিন্তু সেটা ব্যবহার না করে নদীর তীরে জমি লিজ নিয়ে সেখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে। এতে জলজপ্রাণীর সমস্যা হচ্ছে, কৃষি জমি উর্বরতা হারাচ্ছে, পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন। শুধু তাই নয়, আমরা দিন দিন জীব-বৈচিত্র হারিয়ে ফেলছি। এর থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’
শেরপুর পৌরসভার সমাজ উন্নয়ন কর্মকর্তা মুহাম্মদ শরিফ উদ্দিন বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে না পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত বর্জ্য আমাদের জন্য বোঝা হয়ে থাকবে। বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে সরকারি সহযোগিতার প্রয়োজন।’
শেরপুর পৌরসভার প্রশাসক আরিফা সিদ্দিকা বলেন, ‘পৌর এলাকায় যে পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদন হয়, সেটা অষ্টমীতলার ল্যান্ডফিল কাভার করতে পারে না। এ জন্য আমরা মীরগঞ্জ এলাকায় আরেকটি ল্যান্ডফিল (উন্মুক্ত জমি) ব্যবহার করছি। জনগণের ভোগান্তির বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম। এমন অবস্থা থেকে স্থানীয়দের মুক্তি দিতে আমরা যথাযথ উদ্যোগ নেব। জনগণ যেন ভোগান্তির শিকার না হয়, সে জন্য প্রয়োজনে আমরা প্রকল্প হাতে নিয়ে সেটি বাস্তবায়ন করব।’