সকালের লবণভেজা বাতাস, নীল সমুদ্রের ঢেউ আর একান্ত নির্জনতার অনুভূতি চট্টগ্রামের পারকি ও ফুলতলী সমুদ্রসৈকত সম্প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই এখানে ভিড় বাড়ছে তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সের মানুষের। ফুলতলী এখন নতুন গন্তব্য, যেখানে প্রকৃতির নির্জনতা অনেককে টেনে আনে। এটিকে এখন একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিদিন সকাল থেকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভিড়ও জমে ওঠে সৈকতে। শহর ছাড়া শান্ত পরিবেশ আর ঢেউয়ের শব্দ মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি হয় পর্যটকদের জন্য।
আগ্রাবাদ সরকারি কমার্স কলেজের দুজন শিক্ষার্থী ফুলতলীর বালুচরে ছবি তুলছিলেন। তারা বলেছেন, ‘পারকিতে এখন ভিড় অনেক বেশি। তাই একটু নিরিবিলির জন্য ফুলতলীতে এসেছি।’
সৈকতের পাশের রেস্টুরেন্টগুলোয় তখন তরুণ-তরুণীদের আড্ডা, কেউ ছবি তুলছেন, কেউবা ঢেউয়ের পানিতে ভিজে দারুণ সময় কাটাচ্ছেন। বাতাসে ভেসে আসে সামুদ্রিক খাবারের গন্ধ, ব্যস্ত দোকানগুলোর চাঞ্চল্যও চোখে পড়ে।
গত সপ্তাহে নগরীর বাকলিয়া থেকে স্ত্রী ও দুই যমজ কন্যাসন্তান নিয়ে ঘুরতে আসা কলেজশিক্ষক মো. রায়হান উদ্দিন বলেন, ‘সপ্তাহে এক দিন ছুটি পাই। শহরের কোলাহল থেকে বেরিয়ে এখানে না এলে মনে হয় সপ্তাহটাই অসম্পূর্ণ রয়ে গেল।’
তবে সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে নানা অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও ঝুঁকি। সূর্য ডুবলেই সৈকত দ্রুত খালি হয়ে যায়। কারণ পুরো এলাকায় আলোর ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। অন্ধকার নামলে পর্যটকরা নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না।
কর্ণফুলীর দৌলতপুর থেকে আসা রবিউল হাসান বলেন, ‘সন্ধ্যার পর এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু আলো নেই, তাই ভরসা পাই না।’
ফুলতলীতে আসা কলেজছাত্রী হুমায়রা তাসনিম বলেন, ‘চট্টগ্রামের এত কাছে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা, কিন্তু মৌলিক সুবিধাই নেই। পারকিতে আলো না থাকায় ফুলতলীর দিকে চলে এসেছি। অন্তত আলোর ব্যবস্থা ও থাকার নিরাপত্তা তো থাকা উচিত ছিল।’
তা ছাড়া সৈকতে বিচ-বাইকের পাশাপাশি চলাচল করছে ভাড়ায়চালিত কিছু নামিদামি ব্র্যান্ডের বাইক। এসব বাইক ভাড়া নিতে গিয়ে তাদের রোষানলে পড়ছেন পর্যটকরা। একাধিকবার সতর্কবার্তা দেওয়ার পরেও সমুদ্র থেকে এসব বাইক সরানো যাচ্ছে না বলে জানান বিচ ব্যবসায়ী কমিটির সভাপতি। এ ছাড়া গাড়ি পার্কিংয়ের ইজারাও নিয়ে রয়েছে নানা দ্বন্দ্ব।
বাইক ভাড়া নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার পর্যটক তাইছির জুবাইর বলেন, ‘এক ঘণ্টা ভাড়া নিয়েছিলাম ৩০০ টাকা দিয়ে। কিন্তু এক ঘণ্টা হওয়ার আগেই আমার কাছ থেকে বাইক নিয়ে ফেলে এবং ৭০০ টাকা দাবি করে। পরে বাধ্য হয়ে ৫০০ টাকা দিয়েই আসতে হয়েছে।’
আবাসনসংকট ও অসামাজিক কার্যকলাপ তো আছেই। পারকি-ফুলতলীতে পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা নেই। দু-একটি হোটেল-রিসোর্ট থাকলেও সেগুলো নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কিছু স্থাপনায় অসামাজিক কার্যকলাপ চলে প্রকাশ্যে, যা পরিবার নিয়ে আসা পর্যটকদের জন্য বিব্রতকর।
স্থানীয় দোকানদার সাইফুল বলেন, ‘হোটেল আছে ঠিকই, কিন্তু পর্যটকদের থাকার চেয়ে অন্য কর্মকাণ্ডই বেশি হয়। এতে এলাকার বদনাম হয়।’
পর্যটকদের অভিযোগ, অন্ধকার নামলেই সৈকতের বিভিন্ন অংশ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। ট্যুরিস্ট পুলিশের স্থায়ী চৌকি নেই, টহলও নিয়মিত নয়। কর্ণফুলী থানার বন্দর ফাঁড়ি দায়িত্বে থাকলেও সেটি সৈকত থেকে বেশ দূরে।
পর্যটক মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিকেলের পর কয়েকজন যুবকের আচরণে পরিবার নিয়ে থাকা কঠিন হয়ে যায়। পুলিশের উপস্থিতি থাকলে এই সমস্যা হতো না।’
অন্যদিকে পারকির পর্যটন সম্ভাবনা বাড়াতে একটি বড় পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। তবে কাজ বহু দিন ধরে ঝুলে আছে। চলতি বছরের ২৭ আগস্ট উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন পরিদর্শন শেষে কাজ দ্রুত শেষের নির্দেশ দিলেও অগ্রগতি খুব ধীর।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মাজেদুর রহমান বলেন, ‘৯৫ শতাংশ কাজ শেষ। সুপেয় পানির জন্য ওয়াসা আরও দুই মাস সময় চেয়েছে। সৈকত সংরক্ষণ না হলে এ স্থাপনা কোনো কাজে আসবে না।’
অন্য সমস্যাগুলোও তুলে ধরার অনুরোধ করেন তিনি।
সৈকতে প্রবেশের চারটি মূল সড়কই কাঁচা। বর্ষায় কাদা, শুষ্ক মৌসুমে ধুলায় যাতায়াতে ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে। কিছু অংশে ঢালাই করা হলেও এলাকাজুড়ে যোগাযোগব্যবস্থা নড়বড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা বজলু আহমদ বলেন, ‘এত পর্যটক আসেন, কিন্তু রাস্তা দেখে মনে হয় ভাঙাচোরা গ্রাম্য পথে হাঁটছি। রাস্তাঘাট ঠিক হলে পর্যটক বাড়ত।’
মাদক, ছিনতাইয়ের ভয়ে থাকেন পর্যটকরা
সৈকতের একটি বড় সমস্যা হলো নিরাপত্তাহীনতা। সকাল-দুপুর বা গভীর রাতে কিছু এলাকায় মাদকসেবী ও দালাল চক্রের তৎপরতা দেখা যায়। এতে পর্যটকরা আতঙ্কে পড়েন।
এক দোকানদার বলেন, ‘আমরা ব্যবসা করি। কিন্তু মাদকসেবীদের কারণে পরিবেশ খারাপ হয়। পর্যটকরাও ভয় পান।’
তবে স্থানীয় এক দায়িত্বশীল ব্যক্তি দাবি করেন, ‘এখন সৈকতে মাদক নেই। কেউ জড়াতে চাইলে স্থানীয়রা প্রশাসনের সহযোগিতায় বাধা দেবে।’
চুরি, ছিনতাইয়ের ঘটনাও এলাকায় নতুন নয়। পর্যটকদের ব্যাগ-মোবাইল ছিনতাই প্রায়ই ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি জানতে চাইলে বন্দর ফাঁড়ির ইনচার্জ আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘ট্যুরিস্ট পুলিশের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত টহল রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। রোহিঙ্গা এলে তাদের ক্যাম্পে পাঠানো হয়। তা ছাড়া রোহিঙ্গা পাচার কার্যক্রমে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’
রোহিঙ্গা পাচারের গোপন রুট
পারকি এখন রোহিঙ্গা পাচারের অন্যতম রুটে পরিণত হয়েছে। সমুদ্রঘেঁষা খালপথে ট্রলার ভিড়িয়ে পাচারকারীরা রোহিঙ্গাদের নামিয়ে ছড়িয়ে দেয় আশপাশে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শতাধিক রোহিঙ্গা আটক হওয়ার খবর রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, ‘কিছু দালাল চক্র জড়িত। তারা নৌকা এনে মানুষ নামায়। এতে অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে।’
পারকি বিচ ব্যবসায়ী মালিক ও কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘হাজারও মানুষ আসেন, ব্যবসার সুযোগ বাড়ে। কিন্তু সবই চলছে অপরিকল্পিতভাবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই, নিরাপত্তা নেই, রাস্তার মান
খারাপ। বারবার বলেও সমাধান পাই না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার নিয়ম করলেই, রাস্তা ঠিক করলে এবং নিরাপত্তা দিলেই পারকি ও ফুলতলী দেশের শ্রেষ্ঠ পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে।’
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি। পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সড়কের কাজ শিগগিরই শুরু হবে।’
অপার সৌন্দর্যের দুটি সৈকত পারকি ও ফুলতলী। অথচ অবকাঠামো ঘাটতি, আলোর অভাব, নিরাপত্তাহীনতা, মাদক-ছিনতাই, রোহিঙ্গা পাচার ও আবাসনের সংকট সব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র দুটি আজ অরাজকতার শিকার।