তিনটি ছাগলছানা নিয়ে এক বৃদ্ধা থানায় হাজির। জানালেন, মা-ছাগলটি চুরি হয়ে গেছে। ওসি বৃদ্ধার কথা শোনেন। তিনটি ছাগলছানার নির্মম পরিস্থিতি তুলে ধরে ফেসবুকে একটি ভিডিও আপলোড করেন। মুহূর্তেই ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মা ছাগল চুরির কাহিনি বের হয়। বিষয়টি প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর নজরে পড়ে। এরইমধ্যে চোর মা ছাগলটি কসাইখানায় বিক্রি করে দেয়। কসাই সেটি জবাইও করে। এমন অবস্থায় প্রতিমন্ত্রী ফেসবুক লাইভে আসেন। তার নির্দেশে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মা-হারা তিনটি ছাগলছানার দায়িত্ব নেয়। ওসি পরবর্তী সময়ে আরেকটি লাইভে এসে ছাগলছানা সংক্রান্ত আপডেট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবহিত করেন।
কেবল এই ঘটনা নয়, সামাজিকভাবে ছড়িয়ে দিয়ে সুফল পাওয়া প্রায় সব ঘটনার তথ্য ওসি এভাবেই ফেসবুকে উপস্থাপন করেন। পুলিশের এই কর্মকর্তার নাম ইন্সপেক্টর রতন শেখ। তিনি বর্তমানে সুনামগঞ্জ সদর থানায় কর্মরত আছেন। পুলিশি সেবায় ‘ফেসবুক ফার্স্ট’ বিবেচনায় তাকে সিলেট বিভাগের সেরা ওসি ঘোষণা করে পুরষ্কৃত করেছে সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি দপ্তর।
সোমবার (১০ জুন) ওসি রতন শেখ বিভাগের শ্রেষ্ঠ ওসির পুরস্কার ও সনদপত্র গ্রহণ করেন। এদিন সকালে ডিআইজি সিলেট রেঞ্জ কার্যালয়ে মাসিক ক্রাইম কনফারেন্সে বিভাগের সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার তুলে দেন ডিআইজি ড. মো জিল্লুর রহমান।
সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় ওসি রতন শেখ বলেন, ‘এটা আমার ভালো কাজের স্বীকৃতি। এই নিয়ে চতুর্থবারের মতো সিলেট বিভাগের ওসিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করলাম। এর মধ্যে আছে সিলেট জেলায় থাকাকালে দুইবার ও সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় যোগদানের পর দুইবার।’
জানা গেছে, রতন শেখ ট্যুরিস্ট পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিলেন। তার কর্মস্থল ছিল সিলেটের জাফলং। এরপর সিলেটের বাইরের থানায় ওসি হিসেবে এক দফা দায়িত্ব পালন শেষে আবারও সিলেটে ফেরেন। সেই ফেরাটা ছিল জেলার প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর লুটপাট ঠেকানোর জন্য। তাকে সাদাপাথর এলাকার কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি নিযুক্ত করা হয়। ওই সময় থেকে তিনি ফেসবুকে সব তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন শুরু করেন।
সাদাপাথর এলাকায় স্থিতিশীলতা ফিরলে কোম্পানীগঞ্জ থেকে তাকে বদলি করা হয় সুনামগঞ্জ সদর থানায়। সেখানে কর্মরত আছেন প্রায় দুই বছর। ট্যুরিস্ট পুলিশ থেকে থানা পুলিশে পদায়নের পর চারবার তিনি শ্রেষ্ঠ ওসির পুরস্কার পান। এর আগে একবার ‘পিপিএম’ পদকেও ভুষিত হন।
ফেসবুকে ‘সুনামগঞ্জ সদর থানা’ নামে একটি পেজ রয়েছে। তথ্য আদান-প্রদান এবং পুলিশি সেবা জানানোর এই পেজটি ব্যবহার করেন ওসি রতন শেখ। পেজের ফলোয়ার সংখ্যা ৬৩ হাজারের বেশি। এটির মাধ্যমে মানবিক, নিখোঁজ বা অন্য যে কোনো বিষয়ে জনসাধারণকে অবহিত করা হয়।
পেইজে থাকা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পেইজের মাধ্যমে জানানোর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে এক স্কুলছাত্রকে খুঁজে পাওয়া গেছে। স্কুলছাত্রের অভিভাবক বলেছেন, ওসিকে জানানোর পর তিনি স্কুলছাত্রের ছবি দিয়ে পেইজে একটি বার্তা দেন। এক ঘণ্টার মধ্যে স্কুলছাত্রের সন্ধান মেলে একটি রেস্তোঁরায়।
স্কুলছাত্রটি বাবার সঙ্গে রাগ করে একটি রেস্তোঁরায় চাকরি নিয়েছিল। তাকে ফিরে পাওয়ার পর ওসি ওই ছাত্রের বাবাকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে স্কুলছাত্রকে বলেন, ‘বাবা তুমি সেখানে কাজ করছিলে— সেখানে থাকলে বড় হয়ে রেস্তোরাঁর কর্মী হতে পারতে। আর পড়াশোনা করলে এ রকম রেস্তোরাঁর মালিক হতে পারবে। তুমিই বলো মালিক হবে না কর্মী হবে?’ ওসির এই প্রশ্নে স্কুলছাত্র মাথা নেড়ে মালিক হওয়ার কথা জানায়। অর্থ্যাৎ পড়াশোনা করবে বলে জানায়।
সর্বশেষ গত বুধবার বিকেল পাঁচটায় পেজটিতে মর্মান্তিক একটি ঘটনা জানানো হয়। এক স্ট্যাটাসে লেখা হয়, ‘হৃদয় নাড়িয়ে দেওয়া ট্রাজেডি, ঘটনা! সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী। রোল ১। মেয়েটি বোনের মোবাইলফোন ব্যবহার করা নিয়ে বাবার শাসনের কারণে মনের কষ্টে আত্মহত্যা করেছে। এমন প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।....’
ফেসবুকে এ তথ্যের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কিছু ছবিও দেওয়া। এরপর যে পরামর্শ দেওয়া হয়, তা সবার জন্য বিশেষ সতর্ক বার্তা। বলা হয়, ‘সন্তানদের শাসন করার ক্ষেত্রে একটু সতর্ক হবো আমরা’।
নাঈম/