সোমবার ভোর ৫টা। রাজশাহী শহরের শালবাগান মোড় এলাকা। চারপাশে কনকনে শীত, সঙ্গে হিমেল হাওয়া। হঠাৎ সেখানে এক ব্যক্তি সাইকেল থামান। তার পিঠে গামছা, সাইকেলে ঢাকি-কোদাল বাঁধা। নাম জানালেন মো. আজিদ। বয়স ৬৫ বছর। পেশায় দিনমজুর। পবা উপজেলার হরিয়ান সুগার মিল এলাকা থেকে এসেছেন কাজের খোঁজে। এ জন্য তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে ১৫ কিলোমিটার। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও কেউ তাকে কাজে নেননি। বললেন, ‘গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মতো কুয়াশা ঝরছে। দীর্ঘ এই পথ আসতে গিয়ে পুরো শরীর ভিজে গেছে। প্রচণ্ড শীতে হাড়ব্যথা হওয়ার মতো অবস্থা। কিন্তু উপায় নেই। পরিবারের আট সদস্যের মুখে খাবার তুলে দিতে এখানে আসতে হয়েছে। পেট তো আর শীত বোঝে না।’
জেঁকে বসা শীতের দিনে রাজশাহীর অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষের অবস্থা মো. আজিদের মতো। জেলার বেশির ভাগ মানুষ যখন উষ্ণতার খোঁজে লেপ-কম্বলের নিচে সময় কাটান, আজিদের মতো মানুষরা তখন পেটের তাগিদে কাজের সন্ধানে নামেন। কিন্তু তারা সেই কাজের নিশ্চয়তাও পান না। বছরজুড়ে শ্রম বিক্রি করে কোনোরকম সংসার চালাতে পারলেও বর্ষা ও শীত মৌসুমে তাদের কাজ কমে যায়। এই সময় তাদের জীবনে নেমে আসে গভীর অনিশ্চয়তা।
শালবাগান এলাকায় কথা হয় আরও কয়েকজন দিনমজুরের সঙ্গে। তাদের মধ্যে পবা উপজেলার পারিলা এলাকা থেকে এসেছেন মোকসেদ ও আব্দুল গফুর, নগরীর খড়খড়ি বাইপাস থেকে মেরাজ উদ্দিন ও মোসলেম। এ ছাড়া আকবর আলী এসেছেন আশরাফের মোড় থেকে এবং আলাউদ্দিন ও আলমগীরের বাড়ি পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুরে। তারাসহ অন্তত ৩০ জন শ্রমিক সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তারা জানান, আগে দিনে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হতো। কিন্তু শীত শুরুর পর ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকেও কাজ পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। উল্টো যাতায়াত খরচ বাবদ প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকা খরচ হচ্ছে। আয় না থাকায় সংসার চালাতে গিয়ে ধারদেনার ফাঁদে পড়তে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী শহরের রেলগেট, দড়িখরবনা, লক্ষ্মীপুর, শালবাগান ও পবার বায়া এলাকায় প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ শ্রমিক জড়ো হন। এখান থেকেই ঠিকাদার বা ব্যক্তিগত কাজে শ্রমিক নেওয়া হয়। কিন্তু কুয়াশা আর শীতে সেই শ্রমবাজার এখন প্রায় অচল।
রেলগেট এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা ৫৭ বছর বয়সী আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আবহাওয়া ভালো থাকলে আয় হয়। শীত আর বর্ষায় কাজ থাকে না। তবুও কাজের আশায় শীতের মধ্যেই বের হয়েছি। আয় না করলে সংসার চলবে কীভাবে?’ তিনি বলেন, ‘বয়স হলেও বয়স্ক ভাতা পাইনি। জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকেও সহযোগিতা মেলেনি। অসুস্থ হলে আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই।’
রাজশাহী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, গতকাল মঙ্গলবার রাজশাহীতে দিনের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে, সোমবারও দিনের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন রবিবার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে শুক্রবার সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এবারের শীত মৌসুমে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দিনের অধিকাংশ সময় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকছে। এতে সূর্য উত্তাপ ছড়াতে পারছে না। ফলে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। এমন অবস্থায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। রাস্তাঘাট, হাটবাজার, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনালে মানুষের উপস্থিতি কম। সরকারি-বেসরকারি অফিসে চাকরিজীবীরা এলেও কাজে গতি কম। ঠিক এই সময় দিনমজুর শ্রেণির মানুষরা পড়েছেন চরম বিপাকে। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, রাজমিস্ত্রিসহ নিম্ন আয়ের মানুষরা প্রত্যাশিত কাজ পাচ্ছেন না।
এদিকে, শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে গত এক সপ্তাহে অসংখ্য রোগী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের সংখ্যা বেশি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শিশু ও বয়স্কদের বাড়ির বাইরে বের না হওয়াই ভালো। তবে খেটে-খাওয়া মানুষরা সেই অনুযায়ী চলতে পারছেন না।