গোমতী ও পুরোনো তিতাস নদীবিধৌত উপজেলা কুমিল্লার দাউদকান্দি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই উপজেলা এক সময় পাট ব্যবসার জন্য ছিল বিখ্যাত। উপজেলা সদর ও গৌরীপুরে থাকা নদীবন্দরকে ঘিরে এ অঞ্চলটি হয়ে উঠেছিল ব্যবসায়িক কেন্দ্র। পার্শ্ববর্তী হোমনা, তিতাস, মেঘনা এবং চাঁদপুরের কচুয়া ও মতলব উত্তরের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল দাউদকান্দি। উপজেলায় থাকা তিনটি খাল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। বিভিন্ন নৌযানে করে এসব খাল দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া হতো। বর্ষা মৌসুমে জমা পানি খালগুলো দিয়ে মিশে যেত গোমতী ও পুরোনো তিতাস নদীতে।
কিন্তু এখন সবই অতীত। ঐতিহ্যবাহী বাটাখাসি, মাইথারকান্দি ও বলদাখাল এখন মৃতপ্রায়। কোথাও জমেছে কচুরিপানার স্তূপ, কোথাও ময়লার ভাগাড়। অনেকে খালের জমিতে বহুতল পাকা স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। এতে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। নৌযানকেন্দ্রিক এক সময়ের বাণিজ্যও থমকে গেছে। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিচ্ছে। গত বছরের বন্যা শেষে যখন সব এলাকার পানি নেমে যাচ্ছিল, তখন দাউকান্দিবাসীকে জমে থাকা পানির কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্থানীয়রা বলছেন, খালের গতিপথ দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক না করলে আসন্ন বর্ষায় পৌরবাসীকে জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হবে।
তিনটি খালের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে দেখা যায়, খালের দুই পাশ ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ছোট-বড় বিভিন্ন স্থাপনা। এর মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন। খালের মাঝখানের অংশ গোচারণভূমি ও ফসলি খেতে পরিণত হয়েছে।
বিভিন্ন নথি ঘেঁটে ও একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী বলদাখালটি একসময় গোমতী নদীর গোয়ালমারী ইউনিয়নের অংশ থেকে উৎপন্ন হয়ে দাউদকান্দি পৌরসভা ও আশপাশের এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হতো। তখন এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। প্রথমে এটি আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়, এরপর হয় বেদখল।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাল মাইথারকান্দি। গোমতীর শাখা নদ কালাডুমুর থেকে উৎপত্তি হয়ে গৌরীপুর এলাকার পাশ দিয়ে এটি প্রবাহিত হতো। এই খালকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল গৌরীপুর। কিন্তু এটি এখন দখল-দূষণের শিকার। গোমতীর জলধারা থেকে জন্ম নেওয়া উপজেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাল বাটাখাসি। গৌরীপুর বাজারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি মিশত কালাডুমুর নদে। ভরাট হতে হতে এটিও এখন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে।
বলদাখাল গ্রামের বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, ‘এই খাল দিয়ে এক সময় নৌযান চলত। মাছ পাওয়া যেত। পানি দিয়ে ধানের সেচ দেওয়া হতো। এখন এই খালে কোনো পানি নেই। বর্ষায় এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ।’ তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে মৃত খালটি সংস্কারের দাবি জানান।
পৌর বাজারের বাসিন্দা মো. গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘বাজারের ভেতরে এখন খালের অস্তিত্বই নেই। আবর্জনা ফেলে দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদল হলেও কাউকে উচ্ছেদ করা হয়নি।’
গৌরীপুর বাজারের ব্যবসায়ী আলী আশরাফ খান বলেন, ‘গত বছর বৃষ্টির সময় বাজারে পানি জমেছিল। অনেক দোকানের পণ্যের ক্ষতি হয়। পানি সরে যাওয়ার পথ না থাকায় জলাবদ্ধতা কয়েক মাস স্থায়ী হয়। এখনই খালগুলোর পানির গতিপথ ঠিক না করলে আগামী বর্ষা মৌসুমে একই সমস্যা দেখা দেবে।’
এ বিষয়ে দাউদকান্দি পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেদওয়ান ইসলাম বলেন, ‘তিনটি খালের দখলদারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। উচ্ছেদের পর খালগুলোর দুই পাশে রিটেইনিং ওয়াল, লোহার ফেন্স (বেড়া) ও ওয়াকওয়ে বানানো হবে—যেন ভবিষ্যতে কেউ আবর্জনা ফেলে আবারও খালের জায়গা দখল করতে না পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়ার পর কাজ শুরু করা হবে।’
খাল দখলের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা প্রথমে আবর্জনা ফেলে খাল ভরাট করে। এরপর তাদের প্রতিষ্ঠানের খালের দিকে অংশ ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকে। কোথাও কোথাও ৪০ ফুটের খাল ২০ ফুটে নেমে এসেছে।’
জানা গেছে, রিটেইনিং ওয়াল হলো এমন একটি কাঠামো যা অসমতল জায়গায় মাটি, পানিকে ধরে রাখতে ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে মাটির ক্ষয় বা ধস রোধ করা যায়।