সারাদেশের মতো রাজশাহীতেও উৎসবমুখর পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। রাজশাহীর ৬টি সংসদীয় আসনে আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীসহ বিভিন্ন দল এবং স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ৩০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে সব আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
রাজশাহীকে দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন পাঁচটি আসনের সবকটিতে বিএনপি ও চারদলীয় জোটের প্রার্থীরা জয়ী হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পাঁচটির মধ্যে তিনটিতে বিএনপি, একটিতে আওয়ামী লীগ ও একটিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বিজয়ী হন।
২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতসহ প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হন। তবে এবার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। এ প্রেক্ষাপটে বিএনপির জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হলেও মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন কারণে আওয়ামী লীগের একটি অংশ জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দিকে ঝুঁকেছে। এছাড়া, বিএনপির বিদ্রোহীরাও ভোট কাটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ভোটের মাঠে জামায়াত প্রার্থীরা শক্ত ভিত দাঁড় করিয়েছে বলে আভাস মিলেছে।
রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) : স্বাধীনতার পর ১২টি নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পাঁচবার করে বিজয়ী হয়েছে। জামায়াত একবার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার জয় পান। এবার বিএনপির প্রার্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদ ও আমার বাংলাদেশ পার্টির প্রার্থীরাও মাঠে রয়েছেন। দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর ইস্যু এখানে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজশাহী-২ (সদর) : রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে বিএনপি পাঁচবার, আওয়ামী লীগ দুইবার, ওয়ার্কার্স পার্টি তিনবার, জাতীয় পার্টি একবার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী দুইবার জয়ী হয়েছেন। এবার বিএনপির প্রার্থী সাবেক মেয়র ও এমপি মিজানুর রহমান মিনু। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মহানগর নায়েবে আমির ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। আরও কয়েকজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মিনুর জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হলেও তরুণ ও নারী ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে স্থানীয় বিশ্লেষকদের ধারণা।
রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) : বিগত নির্বাচনগুলোর ছয়টিতে আওয়ামী লীগ, চারটিতে বিএনপি এবং দুটিতে জাতীয় পার্টি জয়ী হয়েছে। এবার বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ। বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকায় বিএনপি এখানে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে দীর্ঘ ২৮ বছরের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করায় দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীরও একটি বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। ফলে এখানেও হাড্ডাহাড্ডির আভাস মিলেছে।
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) : ২০০৮ সালে গঠিত এ আসনে এবার বিএনপির প্রার্থী ডিএম জিয়াউর রহমান জিয়া। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী ডা. আব্দুল বারী সরদার।
বিএনপির ভেতরের বিভক্তি এবং স্থানীয় সমীকরণে এখানেও জয়-পরাজয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) : ১২ নির্বাচনের ছয়টিতে আওয়ামী লীগ, পাঁচটিতে বিএনপি এবং একটিতে জাতীয় পার্টি জয়ী হয়েছে। এবার বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল। জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা মনজুর রহমান। বিএনপির দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী মাঠে থাকায় ভোটের সমীকরণ জটিল হয়েছে। কেননা, বিএনপির ভোট তিন ভাগে বিভক্ত হলে সুবিধা পাবে জামায়াত।
রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) : এ আসনে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এবার বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ নাজমুল হক। স্থানীয়ভাবে বিএনপি প্রার্থীর শক্ত অবস্থান থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় সিনিয়র নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, 'আমরা স্বচ্ছ নির্বাচন চাই। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ থাকলে রাজশাহীর ছয়টি আসনসহ দেশের অধিকাংশ আসনে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।'
অন্যদিকে রাজশাহী-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, '১৭ বছর ভোটাররা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। এবার ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন। রাজশাহী বিএনপির ঘাঁটি। রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনেই বিএনপি জয়ী হবে বলে আমরা আশাবাদী।'
নাঈম/