মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে দুই মাস ধরে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী র্যাবিস ভ্যাকসিনের সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ বন্ধ থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আক্রান্তরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। শুধু সরকারি হাসপাতাল নয়, জেলা সদরের ফার্মেসিগুলোতেও দীর্ঘদিন ধরে এই ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে হাসপাতালের এমন সংকট গ্রহণযোগ্য নয়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দ্রুত সময়ের মধ্যেই ভ্যাকসিন সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।
প্রায় ১৬ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মানিকগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল। জেলার সাতটি উপজেলা থেকে প্রতিদিন হাজারও মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত আসেন কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, মানিকগঞ্জে প্রতিদিন গড়ে দেড়শ থেকে দুইশ ডোজ জলাতঙ্ক প্রতিরোধক ভ্যাকসিনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে হাসপাতালটিতে ভ্যাকসিন সরবরাহ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়।
এই ঘাটতির কারণে বাধ্য হয়ে অনেককে পাড়া-মহল্লার ফার্মেসি থেকে ভ্যাকসিন কিনতে হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও একই পরিস্থিতি। প্রায় এক বছর ধরে শহরের ফার্মেসিগুলোতেও র্যাবিস ভ্যাকসিনের স্বাভাবিক সরবরাহ নেই। ফলে প্রাণীর কামড়ের ধকল সামলাতে না সামলাতেই রোগীদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ পড়ছে।
হাসপাতালে ভ্যাকসিন নিতে এসে হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে অনেককে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংকট চললেও সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
ঘিওর উপজেলার নালী ইউনিয়নের সুজন মিয়া বলেন, ‘এক দিন রাতে বাড়িতে ফেরার পথে একটি কুকুর এসে পায়ে কামড় দেয়। সকালেই হাসপাতালে ছুটে আসি। এসে জানতে পারি ভ্যাকসিন নেই। বাইরে খুঁজেও পাইনি। পরে একজন লোক একটা ভ্যাকসিন বাইরে থেকে ম্যানেজ করে আনেন। তার সঙ্গে যৌথভাবে ভ্যাকসিন নিয়েছি। আরও একাধিক ডোজ ভ্যাকসিন নিতে হবে।’
হরিরামপুর উপজেলার কান্ঠাপাড়া এলাকার সালমা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়েকে বিড়ালে আঁচড় দিয়েছিল। অনেক কষ্টে দুই ডোজ সংগ্রহ করেছিলাম। আজ দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। কোনোভাবেই ম্যানেজ করতে পারছি না। বাইরের ফার্মেসিতে যেটা পাওয়া যাচ্ছে সেটাও ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে।’
মানিকগঞ্জ পৌর শহরের বাসিন্দা খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমার স্ত্রীকে কুকুরে কামড়েছে। বাজার থেকে ভ্যাকসিন আনার চেষ্টা করছি। দাম বেশি, তাও মিলছে না। এদিকে, ডাক্তার বলেছেন দেরি না করে ভ্যাকসিন নিতে। কারণ ভ্যাকসিন নেওয়া ছাড়া এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। সরকারের দ্রুত নজর দেওয়া জরুরি।’
পৌর এলাকার বাসিন্দা বুলবুল আহমেদ বলেন, ‘হাসপাতালে এসে শুনি দুই মাস ধরে ভ্যাকসিন নেই। এটা খুবই দুঃখজনক। জেলায় এত রোগী আছে, অথচ ভ্যাকসিন নেই। ফার্মেসিতে নেই, হাসপাতালেও নেই। এখন আমরা যাব কোথায়?’
জেলা শহরের একাধিক ফার্মেসি মালিক জানান, প্রায় এক বছর ধরে এই ভ্যাকসিনের স্বাভাবিক সরবরাহ নেই। তারা কোম্পানিগুলোকে অর্ডার দিলে চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পেতেন। এখন ১০ পিসের অর্ডার দিলে এক পিস দেয়, কখনো কখনো তাও পাওয়া যায় না। যাদের কাছে আগের স্টক আছে তারা এখন বেশি দামে বিক্রি করছেন। সেগুলোও শেষের দিকে।
ভ্যাকসিনসংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মানিকগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স ও ভ্যাকসিন ইনচার্জ সবুজ মিয়া। তিনি বলেন, ‘গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিনই অনেকে ভ্যাকসিনের জন্য আসেন, কিন্তু দিতে পারছি না। যারা বাইরে থেকে সংগ্রহ করে আনছেন তাদের শরীরে পুশ করে দেওয়া হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে দেওয়া হবে।’
হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) এ বি এম তৌহিদুজ্জমান সুমন বলেন, ‘জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরবরাহ বন্ধ থাকায় রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন– সেটা আমরা জানি। ইতোমধ্যে চাহিদাপত্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুত সংকট কাটিয়ে ভ্যাকসিন সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।’