সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ও ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ‘আইবুড়ি নদী’ এখন দখল ও নাব্যসংকটে মৃতপ্রায়। প্রভাবশালী দখলদার চক্রের অবৈধ ভরাট, স্থাপনা নির্মাণ ও নেট-পাটা দিয়ে বাঁধ দেওয়ার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একের পর এক দখলের ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি উদ্যোগে দ্রুত নদীটি খনন করে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা ফিরিয়ে আনা এবং অবিলম্বে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নেট-পাটা অপসারণ এবং নদী খননের মাধ্যমে আইবুড়ি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। নইলে শ্যামনগরের এই ঐতিহ্যবাহী নদী অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদীটির বিভিন্ন অংশে মাটি ফেলে পাড় সংকুচিত করা হয়েছে। কোথাও টিনশেড ঘর, কোথাও স্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠেছে। নদীতে অবৈধভাবে ঘের সম্প্রসারণেরও অভিযোগ রয়েছে। এতে নদীটি দিন দিন সরু খালে পরিণত হচ্ছে।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল গফুর (৬৮) বলেন, ‘একসময় আইবুড়ি নদীতে নিয়মিত জোয়ার-ভাটা হতো, প্রচুর মাছ মিলত। নৌকাই ছিল যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। আয়োজন হতো নৌকাবাইচের মতো উৎসবের। এখন শুকনো মৌসুমে নদীতে হাঁস চরানোর মতোও পানি থাকে না।’ একই কথা বলেন ওই এলাকার বাসিন্দা আবিয়ার গাজী (৫৫) ও রহিমা খাতুন (৫৭)।
অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ নেট-পাটা দিয়ে নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়ায় পলি জমে নাব্য কমে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি দ্রুত নামতে না পেরে দুই তীর প্লাবিত হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে আশপাশের কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গফফার বলেন, ‘অবৈধ দখল আর ভরাটের কারণে নদীটি শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন নদী দখল হয়ে সরু হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। আমাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। প্রশাসন যদি এখনই ব্যবস্থা না নেয়, কয়েক বছরের মধ্যেই নদীর অস্তিত্ব হারিয়ে যাবে।’
ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা রহিমা খাতুনের অভিযোগ, ‘নদী দখলদাররা এলাকার প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। আমরা শুধু দেখেই যাচ্ছি নদীটা কীভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সচেতন মহলের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে নদী-খালের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো দখল ও ভরাট হলে জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।
এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক বলেন, ‘আমি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিষয়টি অবগত হলাম। দ্রুত নদী দখলের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, তদন্ত আর আশ্বাসের বাইরে বাস্তব পদক্ষেপ কবে দেখা যাবে?