হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সবুজ ফসলের মাঠ। যতই দিন যাচ্ছে ততই ধানের হালকা সবুজ রং গাঢ় হচ্ছে। হাওর অধ্যুষিত পুরো সুনামগঞ্জের চিত্র এখন এমন। জেলার অন্য সব হাওরের মতো বিশ্বম্ভপুর উপজেলার খরচার হাওরেও সবুজ ধানের গালিচা পড়ে আছে। সেই সবুজ ফসল দক্ষিণের বাতাসে দোল খাচ্ছে। চমৎকার এই দৃশ্য যে কারও নজর কাড়বে। তবে এই সৌন্দর্য ছাপিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে খরচার হাওরপারের কাটাখালী গ্রামের কৃষক আব্দুল কাইয়ূমের (৭০)। তিনি গত তিন মাস কনকনে শীতে পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে ৩.৩ একর (৩৩ শতক) জমি চাষ করেন। স্বপ্ন দেখেন ফসল গোলায় তুলে সন্তানের মুখে আহার জোগাবেন। তাদের পড়ালেখার খরচ চালাবেন। নিজের ও পরিবারে চিকিৎসা করাবেন। কিন্তু আব্দুল কাইয়ূমের চোখে এখন দুঃস্বপ্নের কালো মেঘ ভর করেছে। কারণ তার ফসলি জমির পাশেই ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ করা হচ্ছে।
জানা গেছে, গতকাল শনিবার ফসল রক্ষা বাঁধের সব কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেশির ভাগ হাওরে এখন পর্যন্ত অর্ধেক কাজ হয়েছে। সময়মতো বাঁধের কাজ না হলে আগাম বন্যায় ফসলডুবির শঙ্কা থাকে। তাই খেতে পর্যাপ্ত ধান থাকা সত্ত্বেও কৃষকরা এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না।
আব্দুল কাইয়ূমের মতো একই অবস্থা তার ইউনিয়নের আবুল কাসেম (৬৫) ও আবু সায়েরের (৪৫)। আবুল কাসেম বলেন, ‘২০১৭ সালে সময়মতো বাঁধ না হওয়ায় ও বাঁধের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি থাকায় আগাম বন্যায় এখানকার শতভাগ ফসল পানির নিচে তলিয়ে যায়। এর পর মানুষ দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছে, হাওরের সব মাছ মরে গেছে। এমনকি ঘাসের অভাবে গরু-ছাগলও মারা গেছে। ২০২০ সালেও আগাম বন্যায় বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়। আমরা চাই বাঁধের কাজ সময়মতো হোক। তা হলে আমরা ফসল গোলায় তুলতে পারব। পরিবার নিয়ে দু-মুঠো ভাত খেতে পারব। আমরা চাই না ২০১৭ অথবা ২০২০ সাল আবার আসুক।’
২০১৭ সালে সুনামগঞ্জের শতভাগ ফসল পানির নিচে তলিয়ে যায়। ওই বছর কৃষকের দুঃখ-দুর্দশার শেষ ছিল না। তাই হাওরপারের মানুষের দাবি, সুনামগঞ্জের কৃষক যেন নিরাপদে, নির্বিঘ্নে গোলায় ফসল তুলতে পারে— স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যেন সেই ব্যবস্থা করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় এ বছর ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ সংস্কার ও নির্মাণ করা হচ্ছে। ১৫ ডিসেম্বর বাঁধের কাজ শুরু হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাঁধের কাজ অর্ধেকও শেষ হয়নি। এতে কৃষকরা স্বস্তির বদলে ফসল হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরে মাত্র একটি ফসল কৃষক যেন গোলায় তুলতে পারে, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বাঁধ নির্মাণের নির্দিষ্ট সময় এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এমনকি বাঁধের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন হাওরসংশ্লিষ্ট নেতাদের পাশাপাশি কৃষকরা। তারা বলছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। বাঁধের কাজে সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে এবারও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। এতে ঝুঁকিতে পড়বে হাওরপারের মানুষের একমাত্র জীবিকা।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিজন সেন রায় বলেন, ‘গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার অনিয়ম, দুর্নীতি আর গাফিলতি বেশি হয়েছে। প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধের কাজের যে হিসাব দিচ্ছে তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। শাল্লা উপজেলাসহ কয়কটি বাঁধের কাজ শুরুই হয়নি। এবারও যদি নির্দিষ্ট সময়ে বাঁধের কাজ শেষ না হয়, অবহেলা করা হয়— তা হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
হাওর ও নদী রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, ‘শুরু থেকেই প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ ঢিমেতালে চলছিল। তারা যে তথ্য দিচ্ছে বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। গত বছর যেসব বাঁধ অক্ষত ছিল, সেসব বাঁধে বরাদ্দ দেখিয়ে হরিলুট চলছে। এবার আগাম বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা যে বাঁধ দিচ্ছে তা প্রথম দফাতেই পানিতে ভেসে যাবে। প্রশাসন ও পাউবো কাজ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। যদি এবার আগাম বন্যায় বাঁধ ভাঙে আর কৃষল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা হলে সব দায় তাদের।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য কাজের গতি কিছুটা ধীর ছিল। তাই সঠিক সময়ে কাজ শেষ হয়নি। কাজের মেয়াদ আরও ১৫ দিন বাড়াতে চিঠি দেওয়া হবে।’ বর্ধিত সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ হবে বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার কাছে বাঁধের কাজের গাফিলতি ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে সুনামগঞ্জের সব বাঁধের কাজ মনিটরিং করা হচ্ছে। বাঁধের কাজে কারও কোনো গাফিলতি বা অনিয়মের খবর জানতে পারলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’