ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই খুলনায় রাজনৈতিক সহিংসতাসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত দুই সপ্তাহে চারটি হত্যাকাণ্ড, আলাদা ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গুলি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অপহরণের মতো ঘটনা আলোচনায় আসছে। চাঁদাবাজদের অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। তবে পুলিশের দাবি, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
জানা যায়, গত শুক্রবার খুলনার দিঘলিয়ায় হাট-বাজার ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বে সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খান মুরাদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। খান মুরাদ স্থানীয় হাজি গ্রামের বাসিন্দা খান মুনসুর আহমেদের ছেলে। এ ঘটনায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে উপজেলা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেনকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। দিঘলিয়া থানার ওসি মো. শাহআলম জানান, টেন্ডার জমা নিয়ে কথা কাটাকাটির জের ধরে খান মুরাদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় আফিল গেট এলাকায় শেখ সোহেল নামের এক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি মাছের ঘের ও ইন্টারনেটের ব্যবসা করেন। ওই দিন দুপুর আড়াইটার দিকে সোহেল আফিলগেট পেট্রল পাম্পসংলগ্ন বিসমিল্লাহ মোটর গ্যারেজে মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য আসেন। বিকেল ৩টা ৫মিনিটে একটি মোটরসাইকেলে করে দুই যুবক ঘটনাস্থলে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।
জানা যায়, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সন্ত্রাসীরা নতুন করে অপরাধ তৎপরতা শুরু করেছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, পেশি শক্তির প্রদর্শন, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণসহ একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। পর পর কয়েকটি হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। অবৈধ অস্ত্রের উৎস খুঁজতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি খুলনায় ইজিবাইক ছিনিয়ে নিতে চালক রানা হাওলাদারকে হত্যার ঘটনায় খুলনার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় ঘাতক রাব্বি ও মিরাজ। পরবর্তী সময়ে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
২৫ ফেব্রুয়ারি দিঘলিয়া হাজীগ্রাম পশ্চিম পাড়া এলাকায় খামারি পরিবার ও হাওলাদার পরিবারের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়। এতে আসাদুল খামারি (৪৫), রিফাত খামারি (১৫) ও আবু তালেব (২৮) গুরুতর আহত হন। তেরখাদায় নির্বাচন নিয়ে দুপক্ষের বিরোধে জখম হন পাঁচজন।
২৩ ফেব্রুয়ারি খুলনায় সান্ধ্য বাজারে ব্যবসায়ী আশা শেখের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আশা শেখ। চাঁদা না দিয়ে দোকান খুললে তাকে রাস্তায় গুলি করে লাশ ফেলে রাখার হুমকি দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনা সমন্বয়কারী মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আদালতে মামলার জটের কারণে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।’
জানা যায়, ২২ ফেব্রুয়ারি নগরীতে সালাম গাজী (৩৬) নামে এক যুবককে কুপিয়ে জখম করে নগদ ৩০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর বাগমারা ব্যাংকার্স গলির সামনে হাওড়া ব্রিজের ওপর এ হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। তিনি লবণচরা থানার রিয়া বাজার এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহীম গাজীর ছেলে।
এর আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি দৌলতপুরে জুয়েলারি ব্যবসায়ী ও শুভ জুয়েলার্সের মালিক সুব্রত অধিকারী (৫২) এবং তার ছেলে খুলনা পাবলিক কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র রিজু অধিকারীকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় নিশাত কমপ্লেক্সসহ দৌলতপুর জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয় এবং আতঙ্ক বিরাজ করছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতে লবণচরা থানার বান্দাবাজার এলাকার আয়নুল ও নগরীর মওলার বাড়ি এলাকায় সোহেল ওরফে চেগা সোহেল (২৮) নামে একজনকে গুলি করা হয়।
এদিকে অপরাধ দমনে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবির সিদ্দিকী শুভ্র। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সজাগ ও তৎপর রয়েছে। নিয়মিত পুলিশি মহড়া চলছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’