বন গবেষণা ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের (বিএফআরআই) একমাত্র মাতৃ বৈলামগাছটির গোড়া কাটা হয়েছে। সংস্থাটির ‘সম্পূর্ণ বৃক্ষে উন্নত মানের আগর রেজিন সঞ্চয়ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন’ প্রকল্পের সীমানাদেয়াল নির্মাণের জন্য গাছটির প্রধান শিকড়গুলো কেটে ফেলা হয়। বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাছটি দাঁড়িয়ে আছে। ছোট একটি ঝোড়ো হাওয়ায় এটি হেলে পড়তে পারে। যেহেতু প্রধান শিকড়গুলো কেটে ফেলা হয়েছে, তাই এটি বাঁচার সম্ভাবনাও কম বলে জানিয়েছেন বিএফআরআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অতিবিপন্ন উদ্ভিদগুলোর মধ্যে অন্যতম দেশের সবচেয়ে উঁচু বৃক্ষ বৈলাম। একসময় সমতলে গাছটি দেখা গেলেও এখন নেই বললেই চলে। সারা দেশে যে কয়টি বৈলামগাছ রয়েছে তা খুবই যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, নির্বিচারে নিধনসহ নানা কারণেই বিলুপ্তির পথে বৃক্ষটি। রাঙামাটির কাপ্তাই ও বিলাইছড়ির সংরক্ষিত বনাঞ্চলে হাতে গোনা কয়েকটি বৈলামগাছ আছে বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৈলাম বড় আকৃতির চিরসবুজ বৃক্ষ। উচ্চতা হয় ৩০ থেকে ৪৫ মিটার পর্যন্ত। অনেকে এটিকে আকাশছোঁয়া বৃক্ষ বলে। গাছের প্রধান কাণ্ড সরল ও সোজা। অনেকটা নলাকার আকৃতির। নিচের দিকটা ডাল-কাণ্ডবিহীন। এটি স্থানীয় পর্যায়ে বইলাম নামেও পরিচিত। ভৌগোলিকভাবে এটি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ায় পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) লাল তালিকায় বৈলাম বিশ্বব্যাপী একটি মহাবিপদাপন্ন প্রজাতির গাছ। বন উজাড়, মাতৃবৃক্ষের অপ্রতুলতা ও অতিরিক্ত কাঠ আহরণের ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে বৈলামগাছ দুষ্প্রাপ্য ও বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-৪ অনুযায়ী এটি সংরক্ষিত গাছ। বৈলামগাছ খুব শক্ত হয় এবং এর কাঠ মূল্যবান আসবাবপত্র, ঘর ও বিম তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
গাছের গোড়া কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রকল্প পরিচালক বিভাগীয় কর্মকর্তা (মণ্ড ও কাগজ) এবং ‘সম্পূর্ণ বৃক্ষে উন্নত মানের আগর রেজিন সঞ্চয়ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন’ প্রকল্পের পরিচালক জাকির হোসাইন বলেন, ‘গাছের গোড়া কাটলে কী সমস্যা? আর গাছ নাই?’ পাল্টা প্রশ্ন করেন তিনি। বলেন, ‘কী জানতে চান লিখিতভাবে দেন।’ লিখিতভাবে না দিলে কথা বলবেন না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএফআরআইতে এ ধরনের আরও গাছ আছে।’ তাহলে মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাসহ অন্য কর্মকর্তারা গিয়ে কাজ বন্ধ করেছেন কেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তারা কি চাইলে কাজ বন্ধ করতে পারেন?’ তিনি প্রতিবেদককে পরামর্শ দেন তাদের পুরো ইনস্টিটিউটে এ ধরনের আর গাছ আছে কি না খুঁজে দেখতে।
প্রতিবেদক প্রায় ২৮ একর আয়তনের বিএফআরইয়ের বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখেন। কোথাও বৈলামগাছ চোখে পড়েনি। ইনস্টিটিউটে আর কোনো মাতৃ বৈলামগাছ আছে কি না–জানতে চাইলে বিএফআরআইয়ের বিভাগীয় কর্মকর্তা অসীম কুমার পাল জানান, বৈলাম দেশের অতিবিপন্ন প্রজাতির একটি গাছ। এই গবেষণাকেন্দ্রে একটিমাত্র মাতৃগাছ আছে। তারা এখান থেকে বীজ নিয়ে চারা তৈরি করে এই গাছকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। বছর দুয়েক আগে কিছু চারা তৈরি করে লাগিয়েছেন। তা টিকবে কি না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই প্রজাতির গাছকে টিকিয়ে রাখতে হলে মাতৃ গাছ অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে।
জানতে চাইলে বিএফআরআইয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হাসিনা মরিয়ম বলেন, ‘সারা দেশে এ ধরনের মাতৃগাছ হাতে গোনা কয়েকটি আছে। সকালে পরিদর্শন করে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছি।’ প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, কাজ বন্ধ করার এখতিয়ার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাসহ অন্য কর্মকর্তাদের নেই–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএফআরআইয়ের পরিচালক কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় খোঁজখবর নিচ্ছে।’
এর আগে আগর গবেষণাগারের ভবন নির্মাণের জন্য কাটা হয়েছে ছোট-বড় অন্তত ৯৭টি গাছ। এ নিয়ে পরিবেশ কর্মীরা আপত্তি তুললেও বিএফআরআই তাদের কাজ অব্যাহত রাখে। বিএফআরআই আগর গবেষণাগার করার জন্য ছয়তলার ভবন নির্মাণ করছে চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুরের বিএফআরআইয়ের অভ্যন্তরে ৫৮ শতক জমিতে। গবেষণাগার নির্মাণের জন্য ‘সম্পূর্ণ বৃক্ষে উন্নত মানের আগর রেজিন সঞ্চয়ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন প্রকল্প’ নেওয়া হয়। ২০২১ সালের জুনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) পৌনে ৭৮ কোটি টাকার প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়।
সরেজমিনে গতকাল বিকেলে দেখা গেছে, বিএফআরআই ফটকের পাশে টিনের ঘেরাও দিয়ে একটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এর বাইরে প্রায় ৫০ বছর বয়সী শত ফুট উঁচু গাছটির মূল কাণ্ড ঘেঁষে কয়েক ফুট গভীর মাটি খোঁড়া হয়েছে। ওই মাটি খুঁড়তে গিয়ে একমাত্র মাতৃ বৈলামগাছটির সব শিকড় কেটে ফেলা হয়েছে। সকালে খবর পেয়ে বিএফআরআইয়ের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
চট্টগ্রাম ডেভেলপমেন্ট ফোরামের মুখপাত্র মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘এর আগেও তারা ৯৭টি গাছ কেটে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন মহাবিদাপন্ন মাতৃগাছ কাটার দুঃসাহস দেখিয়েছে। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’ এ বিষয়ে তিনি বন মন্ত্রাণলয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তিনি বলেন, ‘বন রক্ষক যদি বিপন্ন গাছ ধ্বংস করে, আমরা যাব কোথায়?’