লক্ষ্মীপুর জেলায় কার্যক্রম চালানো ১৬৭টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র ৬৬টির লাইসেন্স রয়েছে। বাকি ৯৫টি চলছে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ করে’ অবৈধভাবে। ফলে একদিকে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে অবৈধভাবে চালু থাকা এসব ভাটা জেলার কৃষিজমি ও পরিবেশ ধ্বংস করছে। বছরের পর বছর ধরে এভাবে চলে আসছে।
গত বছরের নভেম্বর এবং ডিসেম্বরে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কয়েকটি অভিযান চালানো হলেও অজানা কারণে পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি ভেঙে ফেলা ভাটা অভিযানের কয়েকদিন পর আবারও কার্যক্রম শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্স না থাকলেও প্রতি মৌসুমে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে ইটভাটাগুলো তাদের কার্যক্রম চালু রাখছে। যদিও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জনবল সংকট ও নির্বাচনের কারণে এতদিন অভিযান বন্ধ ছিল।
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলার অবৈধ ইটভাটাগুলোতে ২৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এ সময় ৫৮টি ইটভাটায় উচ্ছেদ অভিযান ও ৪১টিকে জরিমানা করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় ৫৮টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি ভাটার লাইসেন্স রয়েছে। বাকি ৫৬টির কোনো বৈধতা নেই। আশরাফুল আলম নামে এক ব্যক্তি রামগতি ও কমলনগরের অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করতে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেছিলেন। ওই রিট পিটিশনের শুনানি শেষে উচ্চ আদালতের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ অবৈধ ইটভাটা বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর ও লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেন।
নির্দেশের পর পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহযোগিতায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েকটি ভাটায় ভাঙচুর চালিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করেন। কিন্তু অভিযোগ আছে, অভিযানের কয়েক দিনের মধ্যেই ভাঙচুর চালানো ভাটাগুলো আবারও অদৃশ্য ক্ষমতার বলে চালু হয়ে যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অবৈধ ইটভাটার সবগুলোই উর্বর কৃষিজমি নষ্ট করে সেগুলোর ওপর গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ভাটায় স্বল্প উচ্চতার টিনের চিমনি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকাশ্য দিবালোকে কাঠ ও মবিল পোড়ানো হচ্ছে। স্থানীয় ফসলিজমির টপ সয়েল কেটে এসব ভাটায় ইট তৈরি করা হচ্ছে। স্কুল, কলেজ ও আবাসিক এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে অধিকাংশই ইটভাটা। এতে একদিকে ফসলিজমি বিলীন হচ্ছে অন্যদিকে এলাকার গাছ কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে জেলার বনজ সম্পদ নষ্ট হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে কয়েকজন ইটভাটা মালিক জানান, তারা লাইসেন্স চেয়েও পাননি। প্রতি মৌসুমে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে তারা ইটভাটা চালিয়ে যাচ্ছেন। মৌসুমের শুরুতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জেলা প্রশাসন তাদের কিছুটা হয়রানি করলেও পরবর্তী সময়ে টাকা দিলে তারা নীরব হয়ে যান। তখন থেকে তাদের আর হয়রানি করা হয় না।
পরিবেশ অধিদপ্তর লক্ষ্মীপুর শাখার উপপরিচালক হারুনুর রশিদ পাটোয়ারী জানান, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া তিনি কোনো অভিযান পরিচালনা করার ক্ষমতা রাখেন না। জেলা প্রশাসন তাকে সহযোগিতা না করায় ইচ্ছা থাকার পরও তিনি কিছু করতে পারছেন না।
এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাসানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্য অভিযোগ ও লাইব্রেরি শাখার সহকারী কমিশনার জান্নাতুল সিদ্দিকা বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে অবৈধ ইটভাটা চালু করার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। জাতীয় নির্বাচন ও জনবল সংকটের কারণে অভিযান চালানো বন্ধ ছিল।’