রাজশাহী ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে ডিমের অস্বাভাবিক দরপতনের কারণে চরম সংকটে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোলট্রির খামারিরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় একের পর এক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং খাদ্যনিরাপত্তা–সবকিছুর ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
খামারিদের তথ্যমতে, বর্তমানে খামার পর্যায়ে একটি ডিম মাত্র ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ একটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ৯ থেকে ১০ টাকা। ফলে প্রতিটি ডিমেই ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই লোকসান দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকায় অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারি তাদের পুঁজি হারিয়ে খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় বছরে ডিমের চাহিদা প্রায় ৩০ কোটি ৩১ লাখ। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৬৬ কোটি ৮৩ লাখ ডিম। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে বাজারে ডিমের অতিরিক্ত সরবরাহ হচ্ছে, যা দাম কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে জেলায় প্রায় ৬ হাজার ৫৭৬ জন পোলট্রি খামারি সক্রিয় আছেন।
তবে রাজশাহী পোলট্রি খামারি সমিতির দাবি, লোকসানের কারণে গত দেড় বছরে এই অঞ্চলে ডিম উৎপাদনকারী খামারের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। একসময়ে যেখানে দুই হাজারের বেশি ছোট ও মাঝারি খামার ছিল, এখন তার অনেকগুলোই বন্ধ হয়ে গেছে।
রাজশাহী পোলট্রি খামারি সমিতির সভাপতি এনামুল হক বলেন, ‘ডিমের দামের বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ক্ষুদ্র খামারগুলো ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাবে। অনেক খামারি ইতোমধ্যে পুঁজি হারিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। তাই সরকারের উচিত ডিমের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া। তাহলে খামারিরা অন্তত উৎপাদন খরচের কাছাকাছি দাম পেতে পারেন। তা না হলে বাজার কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজশাহী নগরীর খামারি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, পোলট্রি খাদ্যের প্রধান উপাদান ভুট্টার দাম প্রতি কেজি ২৫-২৭ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৩২ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে সয়াবিনের দাম ৪৯-৫২ টাকা থেকে বেড়ে ৬২-৭০ টাকায় পৌঁছেছে। সয়াবিন বা ভুট্টার দাম কেজিতে মাত্র ১ টাকা বাড়লেও পোলট্রি ফিড উৎপাদনের খরচ কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই অবস্থায় খামার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্রমাগত লোকসানের কারণে ইতোমধ্যে খামারের চার হাজার মুরগি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো পুরো খামারই বন্ধ করে দিতে হবে।
গোদাগাড়ী উপজেলার কালীপুর গ্রামের খামারি জিয়ারুল ইসলামও একই সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত বছরের অক্টোবরে সাদা ডিম প্রায় ৮ টাকা ১০ পয়সা এবং বাদামি ডিম প্রায় ৯ টাকা ১০ পয়সায় বিক্রি হচ্ছিল। কিন্তু এখন প্রতি ডিমে প্রায় ২ থেকে ৩ টাকা দাম কমে গেছে। শুধু ফেব্রুয়ারিতেই প্রায় এক লাখ টাকার লোকসান হয়েছে।
ক্ষুদ্র খামারিদের অভিযোগ, বড় করপোরেট বিনিয়োগকারীদের বাজারে প্রবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পবা উপজেলার খামারি আতিকুর রহমান বলেন, ‘বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব হ্যাচারি, ফিড মিল এবং বিপণনব্যবস্থা রয়েছে। ফলে তারা কম দামে ডিম বিক্রি করেও টিকে থাকতে পারে। আমাদের মতো ছোট খামারিদের সব উপকরণ খোলাবাজার থেকে কিনতে হয়। তাই আমরা সেই দামে ডিম বিক্রি করতে পারি না।’
তিনি আরও বলেন, বড় উৎপাদনকারীরা প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ লাখ ডিম উৎপাদন করছে এবং তারাই এখন কার্যত বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করছে। আর বাজার থেকে ছোট খামারিদের সরিয়ে দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে দাম কমিয়ে রাখা হচ্ছে।
কৃষি খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, পোলট্রি খাতে ক্ষুদ্র খামারিদের পতন শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং এটি গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি। কারণ এই খাতের সঙ্গে হাজার হাজার পরিবারের জীবিকা জড়িয়ে আছে।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ডিম উৎপাদন, পোলট্রি খামার এবং প্রজনন–সব ক্ষেত্রেই জড়িয়ে পড়েছে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনেক ছোট খামার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যাবে এবং বাজার ধীরে ধীরে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাবে। তাই ক্ষুদ্র খামারিদের টিকিয়ে রাখতে ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, বাজার তদারকি এবং নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।