দেশের দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকার জেলেরা জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে সমুদ্রে যেতে পারছেন না। ঈদকে সামনে রেখে এই পরিস্থিতিতে জেলে, ট্রলার মালিক ও মাছের আড়তদাররা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, কয়েকদিন ধরে তেলের ডিপো ও দোকান ঘুরেও প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় কয়েক লাখ জেলে সমুদ্রগামী ট্রলারে মাছ ধরতে পারছেন না। জেলেরা তেলের দামের ওপর সরকারি প্রণোদনার দাবি জানিয়েছে।
বিশেষ করে ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার ট্রলার ঘাটে অলস বসে আছে। সাধারণত জেলেরা মাছ বিক্রি করে প্রয়োজনীয় রসদ ও জ্বালানি সংগ্রহ করে সমুদ্রে যেতেন, কিন্তু তেলের স্বল্পতার কারণে সমুদ্রযাত্রা এখন স্থগিত। বরগুনার পাথরঘাটা বিএফডিসি বন্দরে স্থবিরতা নেমে এসেছে। তিন দিন ধরে তীব্র ডিজেল সংকটে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারে যেতে পারছেন না শত শত ট্রলারের জেলেরা। এতে আসন্ন ঈদুল ফিতরের আনন্দও ম্লান হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাথরঘাটার সদর ইউনিয়নের জেলে বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে তেলের অভাবে সমুদ্রে যেতে পারছি না। সামনে ঈদ। অথচ এখন আয় অনিশ্চিত। পরিবার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।’ জাকির বিশ্বাস নামে আরেক জেলে বলেন, ‘শুনেছি দোকানগুলোতে তেল আছে। তবে কিনতে গেলে বলা হচ্ছে নেই। অতিরিক্ত দাম দিলে তবেই পাওয়া যায়।’
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, ‘কিছু ব্যবসায়ী বেশি দামে বিক্রির আশায় তেল মজুত করে রেখেছেন। ফলে ট্রলারগুলো ঘাটে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক ট্রলার বাজার-সদাইসহ সব প্রস্তুতি শেষ করেছে, কিন্তু সমুদ্রযাত্রা শুরু করতে পারছে না। এতে জেলে ও ট্রলার মালিকদের লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
স্থানীয় তেল ব্যবসায়ী ফারুক হাওলাদার জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ডিপো থেকে কোটাভিত্তিক তেল সরবরাহ করা হয়। পাথরঘাটায় প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে আড়াই লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে সীমিত পরিমাণ সরবরাহ করা হচ্ছে।
উপজেলার হাড়িটানা এলাকার জেলে রফিক ইসলাম বলেন, ‘ট্রলার ও জাল মেরামত করে বসে রয়েছি। সাগরে ইলিশ নেই, অন্য মাছও ধরা পড়ছে না। অতিরিক্ত টাকা খরচ করে ট্রলার নামালে লোকসান হয়। চরম ক্ষতির মুখে পড়েছি। এনজিওর লোনও রয়েছে, দিতে না পারলে এলাকা ছেড়ে পালাতে হবে।’
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সপ্তাহ ধরে উপকূলীয় এলাকায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে গেছে। আগে প্রতিদিন ডিলারদের মাধ্যমে ৩৫-৪০ ব্যারেল ডিজেল সরবরাহ করা হতো, বর্তমানে তা কমিয়ে প্রায় ১০ ব্যারেলে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে জেলেদের প্রয়োজন অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয়রা বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ফিশিং ট্রলারের ব্যবস্থাপক মাসুম আহমেদ বলেন, ‘ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।’
জ্বালানিসংকটে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেরা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তারা দাবি করেছেন, সমুদ্রগামী ট্রলারের জন্য তেল সহজলভ্য করা এবং বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা জরুরি। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার উপজেলার মহিপুর মৎস্য আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রাজু আহমেদ রাজা বলেন, ‘বর্তমানে জেলের জালে পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়ছে না। অনেক জেলে প্রতিটি ট্রিপেই লোকসান গুনছেন। দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে জেলেদের জন্য তেলের ওপর বিশেষ প্রণোদনা জরুরি।’
মৎস্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় ট্রলার মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের দক্ষিণাঞ্চলের ছয় জেলায় প্রায় ৩ লাখ ১১ হাজার সমুদ্রগামী জেলে রয়েছেন। এর মধ্যে ভোলায় ১ লাখ ৩৭ হাজার, পটুয়াখালীতে ৭৬ হাজার এবং বরগুনায় ৬৪ হাজার। বরিশাল, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে তুলনামূলকভাবে জেলের সংখ্যা কম।
বরিশাল মৎস্য দপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের নিয়ম অনুযায়ী জেলেদের জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়। তবে যদি কেউ তেল মজুত করে, স্থানীয় প্রশাসনকে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নিবন্ধিত জেলেদের নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তাদের জন্য আরও কী সুবিধা দেওয়া যায়, তা নিয়ে মৎস্য বিভাগ সরকারি পর্যায়ে আলোচনা করবে।’
আনোয়ারায় বিপাকে ১৫ হাজার জেলে
একই অবস্থা দেখা গেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। উপজেলার থাকা প্রায় ১৫ হাজার মৎস্যজীবী চরম বিপাকে পড়েছেন। এমন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার থেকে ডিজেলনির্ভর মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকার বড় অংশই ঘাটে নোঙর করা হয়। পূর্বগহিরা ধলঘাট এলাকার মৎস্যজীবী আবদুল আজিজ বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকালে তেল নিতে গিয়ে শুনি তেল নেই। বাধ্য হয়ে আমাদের দুটি ট্রলার মাছ ধরতে পাঠাতে পারিনি। প্রতিদিন বসে থাকলে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।’
গহিরা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আবদুর রহমান জানান, সমিতির অধীনে অন্তত ৫০০ ট্রলার ও নৌকা রয়েছে, যেগুলো পুরোপুরি ডিজেলচালিত। জ্বালানি সংকট দীর্ঘ হলে শুধু জেলেরা নয়, মাছ ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদেরও ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। তিনি বলেন, ‘এক দিন ট্রলার বন্ধ মানে কয়েক লাখ টাকার মাছ বাজারে না আসা। এতে স্থানীয় বাজারেও মাছের সরবরাহ কমে যাচ্ছে।’
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘সরকার খোলা বাজারে জ্বালানি তেল বিক্রি নিয়ন্ত্রণে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। অনেক জায়গায় অনুমোদন ছাড়া তেল বিক্রির অভিযোগ থাকায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে।’ [প্রতিবেদনটি করতে বরগুনা প্রতিনিধি মহিউদ্দিন অপু ও আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি আতিকুল হা-মীম সহায়তা করেছেন।