পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দঘন দিনশেষে মধ্যরাতে কুমিল্লায় ঘটে গেছে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনা। ঈদ আনন্দ ম্লান করে দেওয়া সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন। আহত হয়েছেন অন্তত ২৪ জন।
ঈদের দিন মধ্যরাতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেল ট্রেনটি যখন কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলওয়ে ক্রসিং অতিক্রম করছিল একই সময়ে গেটম্যানের সিগন্যাল না পেয়ে ক্রসিংয়ে ঢুকে পড়ে মামুন পরিবহনের একটি বাস। এতে বাস-ট্রেনের মধ্যে ঘটে সংঘর্ষ। ট্রেনের মুখে আটকে থাকা বাসটিকে নিয়ে যাওয়া হয় এক কিলোমিটার দূরে। যার ফলে দুমড়ে মুচরে যায় বাসটি। হতাহত হন যাত্রীরা।
পদুয়ার বাজার থেকে ১ কিলোমিটার উত্তরে কচুয়া চৌমুহনী এসে যখন বাসটি থামে তখন এর ভেতর থেকে বের হয়ে আসে যাত্রীদের আর্তনাদ। বেঁচে থাকার আকুতি। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে ফায়ার সার্ভিস; স্থানীয়দের সহযোগিতায় বাসের যাত্রীদের উদ্ধার করে পাঠানো হয় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে হাসপাতাল থেকে জানানো হয় ১২ জনের মৃত্যুর সংবাদ। নিহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ দুইজন নারী ও তিনটি শিশু রয়েছে।
চট্টগ্রামের মাইজভান্ডার শরিফে ঈদ উদযাপন শেষে বাড়ি ফিরতে থাকা ট্রেনের যাত্রী ষাটোর্ধ্ব নুরুল ইসলাম বলেন, রাত পৌনে তিনটার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দ শোনা যায়। তখনও আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি, মিনিটখানেক পরে যখন ট্রেনটি থামে- নেমে দেখি ট্রেনের মাথা দিয়ে বাসটিক নিয়ে আসা হয়েছে প্রায় এক কিলোমিটারেরও বেশি পথ। বাসের ভেতরে থাকা যাত্রীদের আত্মচিৎকারে হতবিহব্বল হয়ে পড়ি। শব্দ শুনে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন দুর্ঘটনাস্থলে। সেখান থেকে বেশ কয়েকজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এরপর আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায় ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের লোকজন। এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য আমার ৬০ বছরের জীবনে কখনো দেখিনি।
ট্রেনের আরেক যাত্রী নরসিংদীর বাসিন্দা শাহানারা বেগম বলেন, রাতে যখন ট্রেনটি চলছিল আমরা কিছুটা ঘুমে ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে মনে হলো কোথাও বোমা ব্লাস্ট হয়েছে। ট্রেন থামার পর বুঝতে পারি যাত্রীবাহী একটি বাসকে টেনে হিচড়ে নিয়ে এসেছে ট্রেনটি। ভেতরে থাকা মানুষজন চিৎকার করছেন।
দুপুরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘর সূত্রে নিহতদের পরিচয় জানা যায়। এদের মধ্যে পাঁচজন রয়েছেন যশোর জেলার বাসিন্দা। তারা হলেন- যশোরের লাইজু আক্তার (২৬) ও তার দুই মেয়ে খাদিজা (৬) ও মরিয়ম (৩) এবং একই জেলার চৌগাছার সিরাজুল ইসলাম (৭০) ও কোহিনূর বেগম (৫৫)।
বাকিরা হলেন- নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি বাবুল চৌধুরী (৫৫) ও ফাজিলপুরের মো. সেলিমের ছেলে নজরুল ইসলাম রায়হান (৪৫), চাঁদপুর জেলার চাপাতলি এলাকার মমিনুল হকের ছেলে তাজুল ইসলাম (৬৭), ঝিনাইদহ জেলার মোক্তার বিশ্বাসের ছেলে জুহাদ বিশ্বাস (২৪), মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুরের ওহাব শেখের ছেলে ফচিয়ার রহমান (২৬), চুয়াডাঙ্গার জীবন নগরের বিল্লাল হোসেনের ছেলে সোহেল রানা (২৫) এবং লক্ষ্মীপুর জেলা সদরের সিরাজুল ইসলামের মেয়ে সাঈদা (৯)।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার অজয় ভৌমিক বলেন, হতাহতদের হাসপাতালে আনা হয় রাত চারটার দিকে। ১২ জনের মরদেহ হাসপাতালে আছে। নিহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, দুজন নারী ও তিনটি শিশু রয়েছে।
দুর্ঘটনাস্থলে দুই মন্ত্রী
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মূলত গেটম্যানের অসতর্কতার কারণেই এ দুর্ঘটনার ঘটেছে। এই ক্রসিংয়ে দায়িত্বরত দুজন গেটম্যানকে সামরিক বরখাস্ত করা হয়েছে। নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে রেলওয়ের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে।
এর আগে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে কৃষি, খাদ্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াসিন বলেন, দুর্ঘটনা ও হতাহতের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছেন। এখানে একটি উন্নতমানের গেট নির্মাণ করা হবে। যাতে করে গেটম্যান না থাকলেও অটোমেটিক গেট বন্ধ হয়ে যায়। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এ ধরনের কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. রেজা হাসান বলেন, দুর্ঘটনার কারণ তদন্তে রেলের পক্ষ থেকে দুটি এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পালিয়েছে দুই গেটম্যান, সাময়িক বরখাস্ত
কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর ওই রেলক্রসিংয়ের গেটম্যান হেলাল উদ্দিন ও মেহেদী হাসান পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। ঘটনার পর পরই তাদের দুইজনকে বরখাস্ত করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।
বিষয়টি নিশ্চিত করে রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিভাগীয় ও জোনাল দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শুরু হয়েছে। যাদের অবহেলায় এ দুর্ঘটনা তাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট পাওয়ার পর বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’
ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে জামা-জুতো, মৃত্যুর চিহ্ন
সকালে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারের রেলওয়ে কোচিং থেকে এক কিলোমিটার উত্তরে কচুয়া চৌমুহনী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে লেপটে রয়েছে দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি। বাসের ভাঙা গ্লাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। বাসের ভেতরে দুলছে নতুন একটি পোশাক। পাশেই পড়ে রয়েছে প্লাস্টিকের বাটিভর্তি ভাত, কয়েক জোড়া স্যান্ডেল। পাশে দেখা গেল থেতলে যাওয়া কিছু ফলমূল। ঘটনাস্থলের ১০ থেকে ১২ গজ দূরে রেললাইনে বাসের দুটি চাকাও পড়ে থাকতে দেখা যায়।
এসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান রাসেল বলেন, এই দুর্ঘটনাটি সম্পূর্ণ ক্রসিংয়ের গেটম্যানের কারণে ঘটেছে। সে এখানে ভালোভাবে ডিউটি করে না; নানা রকম নেশায় আসক্ত। তার এই অবহেলার কারণে এত বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেল। ঈদের রাতে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।
পুলিশের এক কর্মকর্তাও বললেন একই কথা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আহতদের বক্তব্য ও স্থানীয়ভাবে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে ঘটনার সময় গেটম্যান গেট না ফেলায় বাস রাস্তা ফাঁকা পেয়ে রেল লাইনে উঠে যায়। এ সময় ট্রেনটি বাসটিকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায়।
এদিকে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর রোববার সকাল ৮টার দিকে আখাউড়া থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটি কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। ১১টার পর রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
জহির আহমেদ/অমিয়/