বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সড়ক বিভাজকে স্থাপিত ধারালো লোহার পাতগুলো মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে। অসচেতনতা ও গতির কারণে পথচারী, মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহনের আরোহীরা এসব লোহায় আঘাত পেয়ে প্রতিনিয়ত আহত হচ্ছেন, বিশেষ করে রাতে এবং কুয়াশার সময় এগুলোর কারণে প্রাণহানি পর্যন্ত ঘটছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সিডিএ অ্যাভিনিউ, মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়ক, বায়েজিদ-অক্সিজেন সড়কসহ নগরীর প্রায় সব প্রধান সড়ক বিভাজকের পাশে ধারালো লোহার পাত বসিয়েছে চিটাগং ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (সিডিএ)। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা করেছেন। ভুক্তভোগীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু সিডিএ তা কর্ণপাত করেনি।
আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা মোটরসাইকেল আরোহী কামরুল ইসলাম জানান, বড় গাড়িকে সাইড দিতে গিয়ে তিনি সড়ক বিভাজকের লোহার পাতে অনেকবার পায়ে ব্যথা পেয়েছেন। লোহার পাতগুলো এমনভাবে সড়কে স্থাপন করা হয়েছে, যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি কলিম সরওয়ার জানান, এই লোহার পাতে লেগে তার গাড়ির চাকা কয়েকবার ফেটেছে। লোহার পাত আর না বসানোর জন্য এবং যেসব সড়কে বসানো হয়েছে তা তুলে ফেলার জন্য তিনি সিডিএ, সিটি করপোরেশনকে চিঠিও দিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
বহদ্দারহাটের বাদুরতলা এলাকার ট্রাকচালক রহিম মিয়া জানান, গত ৩ মে তিনি গ্যারেজ থেকে ট্রাক বের করে ভাড়ার পণ্য লোড করার জন্য কালুরঘাট শিল্প এলাকায় যাচ্ছিলেন। কিন্তু একটি গাড়িকে সাইড দিতে গিয়ে জঙ্গি শাহ মাজারের সামনে সড়কের লোহার পাতের সঙ্গে লেগে তার গাড়ির সামনের চাকা ফেটে যায়। চাকাটি এমন জায়গায় ফেটেছে, যেখানে গাড়ি পার্ক করে স্পেয়ার চাকা লাগানোর সুযোগ ছিল না। কারণ গাড়ি দাঁড় করালেই দীর্ঘ যানজট লেগে যেত। ওই চাকা দিয়েই গাড়ি চালিয়ে তিনি গ্যারেজে যেতে বাধ্য হন।
নগরবিদ ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের নেতা প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ‘সড়কে এ ধরনের ধারালো লোহার পাত স্থাপন সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত। ডিভাইডার রক্ষার জন্য আরও অনেক পদ্ধতি রয়েছে। প্রকৃত নিয়ম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ডিভাইডার দেখলেই বোঝা যায়। রাস্তা ও ডিভাইডারের সংযোগস্থলে নিচের দিকটা সামান্য ঢালু বা স্লোপ রাখা হয়। একে ট্রাফিকের ভাষায় মাউন্টেড কার্ব বা স্লোপিং কার্ব বলা হয়।
কিন্তু সিডিএ বর্তমানে যে লোহার পাত বসিয়েছে, সেগুলো অনেক স্থানে মরিচা পড়া বা রং চটে যাওয়ায় দূর থেকে বোঝা যায় না। দ্রুতগতির যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজকের এই লোহার পাত বা রডে সরাসরি আঘাত করলেই দুর্ঘটনা ঘটে। তা ছাড়া রাতে রাস্তা পারাপারের সময় পথচারীরা প্রায়ই এসব বিভাজকে হোঁচট খেয়ে পড়ে যান।’
চিটাগং ডেভেলপমেন্ট ফোরামের মুখপাত্র খোরশেদ আলম বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের সড়ক বিভাজক রক্ষায় লোহার পাত বা অ্যাঙ্গেল ব্যবহার জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পথচারী পারাপার এবং যানজটের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহী এবং পথচারীদের জন্য এগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষায় যখন সড়ক ডুবে যায়, তখন এসব লোহার পাত দেখা যায় না। তখন অনেক পথচারীর পা কেটে যায়। গাড়ির চাকা ফেটে যায়।’
তিনি নিজেও কয়েকবার এসব লোহার পাতে ব্যথা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘অসাবধানতাবশত পথচারী বা সাইকেল-মোটরসাইকেল আরোহীরা ডিভাইডারে ধাক্কা খেলে বা পা পিছলে গেলে এই লোহার পাতগুলো ব্লেডের মতো কাজ করে। ফলে গুরুতর জখম বা অঙ্গহানির মতো ঘটনা ঘটে। তা ছাড়া এগুলোর কারণে সড়কের সৌন্দর্যও নষ্ট হচ্ছে।’
লোহার পাতের পরিবর্তে সৌন্দর্যবর্ধক ও নিরাপদ কংক্রিটের ডিভাইডার নির্মাণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনা এড়াতে উন্নত দেশগুলোর মতো ফ্লেক্সিবল বা স্প্রিংযুক্ত ট্রাফিক পোস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে, যা কোনো গাড়ির ধাক্কায় ভেঙে না গিয়ে কিছুটা নুয়ে পড়ে।’
সিডিএর নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন জানান, সড়ক বিভাজকের ধারালো লোহার পাতের কারণে দুর্ঘটনার বিষয়সহ নগরীর জন্য করণীয় সব বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমকর্মী, বিশেষজ্ঞসহ সবার সঙ্গে বসবেন। নাগরিক দুর্ভোগ লাঘবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান তিনি।