সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব আব্দুল গণি জীবনের শেষ সময়ে ছেলের প্রতিষ্ঠা দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। তার ছেলে সাজিদুর রহমান (৩০) ইউরোপ যাওয়ার পথে মারা গেছেন। সন্তানের মরদেহ তিনি শেষবার দেখতে পারবেন না, এই কষ্টই এখন তার জীবনের বড় আক্ষেপ।
পরিবার জানায়, গত ১৫ জানুয়ারি সাজিদুর রহমান বাড়ি থেকে যাত্রা করেন। দালালের মাধ্যমে তাকে পাঠানো হয়। ছয় লাখ টাকা আগেই দেওয়া হয়েছিল, বাকি টাকা গ্রিসে পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল। ঈদের আগের দিন তিনি পরিবারের সঙ্গে শেষবার কথা বলেন এবং দোয়া চান। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। পরে তার মৃত্যুর খবর আসে।
সাজিদুর রহমান স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করতেন। তার সঙ্গে একই নৌকায় মারা যান একই গ্রামের নুরুজ্জামান ময়না (২৫) এবং পাশের ইউনিয়নের মুজিবুর রহমান।
নুরুজ্জামানের ভাই আক্তারুজ্জামান জানান, তার ভাইও ১৫ জানুয়ারি বাড়ি থেকে বের হন এবং ২২ জানুয়ারি লিবিয়ায় পৌঁছান। পরে দালালরা আশ্বাস দেয় যাত্রা নিরাপদ হবে। কিন্তু বাস্তবে খাবার ও পানির অভাবেই তার মৃত্যু হয়। মাঝপথে তাকে ফেরানোর চেষ্টা করা হলেও দালালরা আশ্বস্ত করে যাত্রা সফল হবে বলে। শেষ পর্যন্ত সবকিছুই শেষ হয়ে যায়।
এদিকে একই এলাকার লিটন মিয়া জানান, তার ছেলেও একই পথে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঝুঁকি বুঝতে পেরে তিনি তাকে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে আনেন। তিনি বলেন, অভিভাবকদের সচেতন হলে এমন ঘটনা কমবে।
স্থানীয় বাসিন্দা আলী আসকর বলেন, দালালদের লোভে পড়ে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ যেতে চান। কিন্তু একই গ্রামের তিনজনের মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক। তিনি অভিযোগ করেন, নৌকায় তাদের খাবার ও পানি দেওয়া হয়নি, যার ফলে এই মৃত্যু হয়েছে। তিনি দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এভাবে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ১২ জন তরুণ ইউরোপ যাওয়ার পথে লিবিয়ার সাগরে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। গত ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে নৌকাটি গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয় এবং পরে ভূমধ্যসাগরে পথ হারিয়ে ফেলে। টানা ৬ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ২২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি। অবৈধ পথে গ্রিসে যাওয়ার সময় খাদ্য ও পানির অভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার ও স্থানীয় সূত্র।
পুলিশ জানিয়েছে, সুনামগঞ্জের ১২ জনের মধ্যে দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুরের পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজারের একজন রয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের নুরুজ্জামান সরদার ময়না, সাজিদুর রহমান, সাহান এহিয়া, রাজানগর ইউনিয়নের মুজিবুর রহমান, মাটিয়াপুরের তায়েফ, বাউসির সোহান। দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগরের আবু ফাহিম। জগন্নাথপুর উপজেলার সোহানুর রহমান, শায়েক আহমেদ, মো. নাঈম, আমিনুর রহমান ও মোহাম্মদ আলী।
এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারগুলো শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, দালালদের প্রলোভনে পড়ে যেন আর কেউ এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে না যান, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।