দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া। প্রতিদিন হাজারও মানুষ এই নৌপথ ব্যবহার করে জীবিকা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নানা প্রয়োজনে রাজধানীতে যাতায়াত করেন। কিন্তু গত বছরের ভয়াবহ ভাঙনের পর মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া লঞ্চঘাট এখনো স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হয়নি। এতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ঘাটটি পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত বছরের আগস্টের শুরুতে পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতের তোড়ে পাটুরিয়া লঞ্চঘাটের একটি জেটি সম্পূর্ণ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এর পর ৫ আগস্ট দুপুরে আরেকটি জেটির নিচের মাটি সরে গেলে সেটিও মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে। এতে করে ঘাটের অবস্থা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং যাত্রী পারাপারের জন্য লঞ্চঘাট সরিয়ে নেওয়া হয় পাশের ২ নম্বর ফেরিঘাট এলাকায়। কয়েক মাস পর আবার লঞ্চঘাটটি আগের জায়গায় নিয়ে আসা হয়। তবে দীর্ঘসময় পেরিয়ে গেলেও ঘাটটি রক্ষায় কোনো স্থায়ী উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে আগের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে পুরো এলাকা।
ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভাঙন ঠেকাতে ফেলা বালুভর্তি জিওব্যাগের অধিকাংশই নদীতে তলিয়ে গেছে। ভাঙনের কারণে যাত্রী ছাউনির একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। জেটি না থাকায় লঞ্চে ওঠানামার জন্য বালুর বস্তা দিয়ে অস্থায়ী একটি সরু পথ তৈরি করা হয়েছে।
এই পথটি দিয়ে প্রতিদিন যাত্রীদের ওঠানামা করতে হচ্ছে চরম ঝুঁকি নিয়ে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের জন্য এটি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
ঘাট ব্যবহারকারী যাত্রীরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে লঞ্চে ওঠানামা করা অত্যন্ত কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। মাগুরা থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন গৃহিণী তাহিয়া রহমান তাইবা। তিনি বলেন, ‘আগে জেটি থাকায় সহজে ওঠানামা করা যেত। এখন বালুর বস্তার ওপর দিয়ে চলতে হয়। একটু অসতর্ক হলেই পা পিছলে নদীতে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে।’
একটি সরকারি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মো. সালাউদ্দিন বলেন, ‘বাচ্চা ও বয়স্ক মানুষদের নিয়ে চলাচল করা খুবই কষ্টকর। বর্ষা এলে পানি বাড়বে, তখন এই পথ দিয়ে যাতায়াত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। আজ আমার পরিবার অনেক কষ্ট করে পন্টুন থেকে উপরে উঠেছে।’
রাজবাড়ীর বাসিন্দা সোহেল খান বলেন, ‘আমাদের দৌলতদিয়া লঞ্চঘাটের অবস্থা এই পাটুরিয়ার চেয়ে অনেক ভালো। গতবারের বর্ষায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। দ্রুত ঘাট সংস্কারে ব্যবস্থা না নিলে এই ঘাট বিলীন হয়ে যাবে।’
ঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছোট ছোট ব্যবসাও এখন ধুঁকছে। যাত্রী কমে যাওয়ায় বিক্রি কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। স্থানীয় বিক্রেতা আলী হোসেন বলেন, ‘আগে প্রতিদিন ৩-৪ হাজার টাকা বিক্রি হতো। এখন ২ হাজার টাকাও হয় না। লঞ্চঘাটে লোক কমে গেছে। অনেক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।’
লঞ্চের মাস্টার ও সুকানিরা বলছেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এই ঘাটে ভাঙন দেখা দিলেও আগাম কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। আগে থেকে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষতি বাড়ে। এবারও যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তা হলে ঘাটের যা অবশিষ্ট আছে তাও টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
পাটুরিয়া লঞ্চঘাটের ম্যানেজার পান্নালাল নন্দী বলেন, ‘গত বছর পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতের কারণে লঞ্চঘাট ও জেটি সম্পূর্ণ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত ঘাট রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এভাবে চলতে থাকলে বর্ষা মৌসুমে এবার এই ঘাটের অস্তিত্ব থাকবে না। আমরা বিআইডব্লিউটিএ’কে এ ব্যাপারে অবহিত করলেও তারা আমাদের কথার গুরুত্ব দিচ্ছে না।’
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর আরিচা নদীবন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল আলম জানান, ঘাটের বর্তমান অবস্থার বিষয়টি তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে লিখিতভাবে অবহিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘মূল সমস্যা হচ্ছে নদীশাসনের অভাব। এ কাজটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন। নদীশাসন ছাড়া শুধু ঘাটে কাজ করলে তা টেকসই হবে না। তাই আমরা আপাতত যাত্রীদের চলাচলের জন্য অস্থায়ীভাবে বালুর বস্তা দিয়ে রাস্তা তৈরি করে দিয়েছি।’