পানিতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে পাহাড়ে আজ রবিবার শুরু হচ্ছে তিন দিনের বর্ষবরণ উৎসব। পুরোনো বছরকে বিদায় জানাতে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে নদীতে ফুল ভাসান পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাদের বিশ্বাস, এ ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে পুরোনো বছরের দুঃখ, গ্লানি, হতাশা, অমঙ্গল মুছে গিয়ে নতুন বছরে সুখ, শান্তি, কল্যাণ বয়ে আনে। পাহাড়ের প্রধান এ সামাজিক উৎসবকে ঘিরে নানান বর্ণে আর আয়োজনে সেজেছে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পাহাড়ি জনপদ। উৎসবের এ আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।
মূলত চৈত্রসংক্রান্তিতে বাংলাবষের্র বিদায় ও বরণ উপলক্ষে এ উৎসব উদযাপন করেন পাহাড়ি জনগণ। চলে ২৯ চৈত্র থেকে পহেলা বৈশাখ পর্যন্ত। নদীতে ফুল ভাসিয়ে শুরু হয় তিন দিনের উৎসব। বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের অংশগ্রহণে এটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুক, মারমারা সাংগ্রাইং আর চাকমারা উৎসবটিকে বিজু নামে পালন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৩টি পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসাবি। এর বাইরে তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু, রাখাইনরা সাংক্রান ও অহমিয়ারা বিহু, সাঁওতালরা পাতা নামে তিন দিনের উৎসব পালন করে।
উৎসবের প্রথম দিনকে চাকমারা ফুলবিজু, মারমারা পাইংছোয়াই, ত্রিপুরারা হারিবৈসুক নামে পালন করে। এদিন থেকে পাহাড়িদের ঘরে ঘরে শুরু হয় আপ্যায়নের নানা আয়োজন। ঘরগুলো সাজানো হয় বিজু ফুল ও নিম পাতা দিয়ে। ১৩ এপ্রিল উদযাপিত হবে উৎসবের মূল দিবস। এ দিন চাকমারা মূলবিজু, মারমারা সাংগ্রাইং আক্যা, ত্রিপুরারা বৈসুকমা নামে পালন করে উৎসবটির।
১৪ এপ্রিল অর্থাৎ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন বা উৎসবের তৃতীয় দিন চাকমারা গোজ্যেপোজ্যে, মারমারা সাংগ্রাইং ও ত্রিপুরারা বিসিকাতাল নামে পালন করবে। বৈসাবির এ দিনে হয় বর্ষবরণ বা বৈশাখী উৎসব। এরপর ১৫ এপ্রিল থেকে সপ্তাহব্যাপী রাঙামাটিসহ তিন জেলার বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হবে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সাংগ্রাইং জলোৎসব। আর এর মধ্য দিয়েই পাহাড়ের এই বর্ণিল বর্ষবরণ উৎসব শুরু হবে। আগামী ১৭ এপ্রিল রাঙামাটির মারী স্টেডিয়ামে জল উৎসবের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ উৎসব।
উৎসবে পাহাড়িদের ঘরে ঘরে পাজন (পাঁচন) ও তরমুজ পরিবেশন করা হয়। কমপক্ষে ২১ পদের সবজি মিশিয়ে রান্না হয় সুস্বাদু পাজন তরকারি। এ ছাড়া পরিবেশন করা হয় ঘরে তৈরি মদ, মিষ্টান্ন, পায়েস, পানীয়, ফল ও ভোজনসহ নানা খাবার। আবহমান বাংলার চিরাতি বৈশাখী উৎসবের অংশীদার হন পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ।
রাঙামাটিতে আজ সকালে রাঙামাটি শহরের কাপ্তাই হ্রদের তীরে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে সূচিত হবে উৎসবটির। রাঙামাটি রাজবন বিহারের পূর্ব ঘাটে আনুষ্ঠানিক ফুল ভাসানো হবে উৎসব উদযাপন কমিটির উদ্যোগে। এ ছাড়া শহরের গর্জনতলী মধ্যম দ্বীপে ও তবলছড়ির কেরানী পাহাড় ঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে ভাসানো হবে ফুল।
খাগড়াছড়িতে চাকমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ মাঈনী ও চেঙ্গী নদীর তীরের বিভিন্ন স্থানে ফুল ভাসাবেন। আর বান্দরবানে সাঙ্গু নদীতে ফুল ভাসাবেন চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ।