পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা পরিষদ উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের চুলের কাটিং বা ‘হেয়ার স্টাইল’ সুনির্দিষ্ট করে জারি করা একটি নোটিশকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নোটিশে শিক্ষার্থীদের মাথার চুল ঠিক কীভাবে কাটতে হবে, তার ছবিও টাঙিয়ে দিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। তবে প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত রুচি ও চুলের স্টাইল নির্ধারণ করে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে ‘বাড়তি চাপ’ ও ‘ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দেখছেন অভিভাবকসহ বিশিষ্টজনরা।
গত বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লিটন উদ্দিন স্বাক্ষরিত ওই নোটিশটি স্কুলের দেয়ালে টাঙানো হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে শিক্ষার্থীদের নোটিশে প্রদর্শিত ছবির আদলে চুল ছেঁটে এবং হাত-পায়ের নখ কেটে বিদ্যালয়ে আসতে হবে। নোটিশের সঙ্গে চার দিক থেকে তোলা একটি শিশুর চুলের কাটিংয়ের ছবি যুক্ত করা হয়েছে, যা অনেকটা ‘আর্মি কাট’ বা ছোট করে ছাঁটা চুলের মতো। নির্ধারিত মডেলের বাইরে চুল কাটলে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এই নির্দেশনার আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পাবনার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলার প্রয়োজন আছে, কিন্তু একজন ছাত্রের মাথার চুল কতটুকু ছোট হবে বা তার কাটিং কেমন হবে, তা কি কোনো প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে নির্ধারণ করে দেওয়া যায়? এটি শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে ক্ষুণ্ণ করছে কি না— তা ভেবে দেখা জরুরি।’
পাবনা পিটিআইয়ের সাবেক সুপারিনটেনডেন্ট আ. সালাম সিকদার শিশুদের ওপর এমন গাইডলাইন আরোপের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘শিশুদের এভাবে কঠোর গাইডলাইন দিলে তাদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’
মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক ও সাঁথিয়ার ধুলাউড়ি মহাবিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যক্ষ জাভেদ বাবু ইসলাম বিষয়টিকে কোমলমতি শিশুদের ওপর ‘বাড়তি মানসিক চাপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ‘চুল কাটার মতো ব্যক্তিগত একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যখন শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়, তখন শিশুদের মনে ভীতি তৈরি হয়। এটি তাদের সৃজনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে এবং স্কুলের প্রতি তাদের এক ধরনের অনীহা তৈরি হতে পারে।’
সাঁথিয়া পৌর সদরের বাসিন্দা আলী নায়েব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শৃঙ্খলার একটা সীমা থাকা উচিত। শিক্ষার্থীদের ওপর এমন হুকুমজারি অনেকটা সামরিক শাসনের মতো মনে হচ্ছে।’
স্কুলে চুল কাটা নিয়ে কড়াকড়ির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক আরিফুল ইসলাম। তিনি মনে করেন, বাহ্যিক অবয়ব পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকৃত সুশিক্ষা অর্জন সম্ভব নয়। শিশুদের নিজস্ব রুচি ও পছন্দের অধিকার খর্ব করে শৃঙ্খলা চাপিয়ে দেওয়াকে অনুচিত বলে উল্লেখ করেন তিনি। আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘চুল কাটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের শাস্তির ভয় দেখানো হলে তারা চরম মানসিক চাপের মুখে পড়বে।’
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক লিটন উদ্দিন দাবি করেছেন, শৃঙ্খলার খাতিরেই তারা প্রশাসনিক নির্দেশনাটি কার্যকর করছেন। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাকে শনিবার তার অফিসে ডেকেছিলেন। তবে তিনি জানান, তারা এখন পর্যন্ত নোটিশটি প্রত্যাহার করেননি। তবে কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে সাঁথিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সোলায়মান হোসেন জানান, শিক্ষার্থী মার্জিত পোশাক পরে বিদ্যালয়ে আসবে। তবে বিশেষভাবে চুল কেটে বিদ্যালয়ে আনার ব্যাপারে সরকারি কোনো বিধি নেই ।
বিদ্যালয়টির সভাপতি ও সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিজু তামান্না জানান, বর্তমানে অনেক ছাত্রকে নিয়মবহির্ভূত বড় চুল রাখতে দেখা যায়, যা দৃষ্টিকটু। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও নিয়মানুবর্তিতা গড়ে তুলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একে নেতিবাচকভাবে না দেখে ইতিবাচক হিসেবে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ইউএনও জানিয়েছেন, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ও পাবনা জেলা প্রশাসক এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন।