জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় (জাককানইবি) শাখা ছাত্রদলে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে নতুন নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং আহ্বায়ক কমিটির প্রলম্বিত মেয়াদে সাংগঠনিক কার্যক্রমে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে। আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ পাঁচ বছর পার হলেও নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ বা কার্যকর কমিটি আলোর মুখ দেখেনি, যা সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝে গভীর হতাশা সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো এবং জন্ম দিয়েছে নেতৃত্ব সংকটের।
২০২১ সালের ৬ জুন ইমরান হোসেন প্রধানকে আহ্বায়ক এবং আল আমিনকে সদস্য সচিব করে ২৭ সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ মাত্র ৩ মাস, কিন্তু নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ দাঁড়িয়েছে ৫ বছরে।
২০২৫ সালের ১১ মে কমিটি গঠনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি শাকির আহমেদ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর সানি এবং মো. রিসালাত ইসলাম সজীবকে দায়িত্ব প্রদান করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি। পরবর্তীতে ২১ মে নতুন কমিটি গঠনের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি জাঁকজমকপূর্ণ কর্মীসভা অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে অতি দ্রুত নতুন কমিটি ঘোষণার আশ্বাস দেন কেন্দ্রীয় নেতারা। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতাদের সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন আজও অধরা।
এদিকে, ২৭ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির ২০ জনই এখন আর রাজপথে সক্রিয় নন। অধিকাংশ নেতার ছাত্রত্ব বহু আগেই শেষ হয়েছে। ফলে মাঠ পর্যায়ে কোনো চেইন-অফ-কমান্ড অবশিষ্ট নেই। তবে ৫ আগস্টের পর নিজেদের নির্যাতিত-বঞ্চিত দাবি করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ছাত্রত্ব ফিরে পেয়েছেন নতুন কমিটিতে পদপ্রত্যাশী একাধিক ছাত্রদল নেতা। এ সবকিছুর পরেও নতুন কমিটি গঠন না হওয়ায় নেতাকর্মীদের মাঝেও হতাশা বিরাজ করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক হিমেল আহম্মেদ বলেন, ২০২৫ সালের ২১ মে নতুন কমিটি গঠনের লক্ষ্যে আয়োজিত কর্মী সম্মেলন নেতাকর্মীদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করলেও দুঃখজনকভাবে সেই প্রত্যাশার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেনি; বরং পরবর্তীতে রাজনৈতিক সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। নেতৃত্ব প্রত্যাশীদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক তৎপরতা এবং ২৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির অনেকের সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা ছাত্রদলের কার্যক্রমকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে ক্যাম্পাসে একটি স্পষ্ট নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি হওয়ার পথে, যার সুযোগ নিচ্ছে সক্রিয় গুপ্ত সংগঠনগুলো। পরিবর্তনশীল সময়ে সাংগঠনিক উপস্থিতি দুর্বল থাকায় গুপ্ত সংগঠনগুলো কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এ মুহূর্তে সময়োপযোগী ও শক্তিশালী কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামো অত্যাবশ্যক।
শাখা ছাত্রদলের আরেক যুগ্ম-আহ্বায়ক ইমরান আহমেদ ফরাজি বলেন, কর্মীসভা হয়েছে প্রায় ১ বছর। কর্মীসভার পরে আসলে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পরে। এ কারণে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল এখন আর সুসংগঠিত নেই। আমি চাই খুব দ্রুতই যেনো শাখা ছাত্রদলের নতুন কমিটি করা হয় এবং যারা বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে হামলা-মামলার শিকার হয়েও মাঠে থেকেছে এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শের পক্ষে লড়াই করে গেছে, তাদেরকে যেনো মূল্যায়ন করা হয়। একটি সঠিক নেতৃত্ব নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলকে আরও সুসংগঠিত করবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।
আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মামুন সরকার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না হওয়ায় সংগঠন গতি হারাচ্ছে এবং যোগ্য নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মেধাবী ও ত্যাগী কর্মীরা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছেন। এছাড়াও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপ তৈরি হচ্ছে, যা সংগঠনের ঐক্য নষ্ট করছে। বিগত সময় ধরে যারা ছাত্র রাজনীতি করে আসছে তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিয়েও শঙ্কা বাড়ছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি অনুরোধ দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য একটি কমিটি গঠন করা হোক। আমি মনে করি যোগ্যতা, ত্যাগ ও সাংগঠনিক দক্ষতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করা উচিত।
শাখা ছাত্রদলের কর্মী শাহাদাত হোসেন চঞ্চল বলেন, পরিবর্তনশীল সময়ের চাহিদা অনুযায়ী যে ধরনের ছাত্ররাজনীতি প্রয়োজন সেটি সম্ভব হচ্ছে না অস্থিতিশীল রাজনৈতিক সংকট থাকায়। শিক্ষার্থীরাও এই সংকট অনুভব করছে। শিক্ষার্থী বান্ধব যুগোপযোগী নেতৃত্ব নিয়ে আগ্রহ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে গতিশীল ছাত্ররাজনীতি ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রদলের প্রতি সকল স্তরের মানুষের ব্যাপক প্রত্যাশা রয়েছে। আশা করছি খুব শীঘ্রই সকলের প্রত্যাশা পূরণ হবে।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, ইউনিটটির টিম লিডার এবং কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি শাকির আহমেদের পছন্দের প্রার্থীকে সুযোগ দিতেই বিলম্ব করা হচ্ছে কমিটি। তবে বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমার পছন্দের কোনো ক্যান্ডিডেট নেই। আমার কারণে কমিটি গঠনে বিলম্ব হচ্ছে, বিষয়টা এমন না। এখানে বেশকিছু জটিলতা রয়েছে। স্থানীয় অভিভাবক ও নেতাকর্মীরাও চাচ্ছিলেন নির্বাচনের পর যেন কমিটি হয়। মূলত রানিং স্টুডেন্টদের সমন্বয়ে নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত রয়েছে। সেক্ষেত্রে দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রেও পরিপক্বতার বিষয় রয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী সবকিছু যাচাই-বাছাই চলছে, আমরাও চেষ্টা করছি। আশা করি এ মাসের মধ্যেই কমিটি ঘোষণা করা হবে।
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইমরান হোসেন প্রধান বলেন, ছাত্রদলের কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে সবসময় শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা করেছি। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার আমরা আলোচনায় বসেছি। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ যদি নতুন কমিটি গঠনের প্রয়োজনবোধ করে, সেটিকে আমরা স্বাগত জানাই। এর মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসবে এবং সংগঠনও গতিশীল হবে বলে আশা রাখি।
কমিটি গঠনের বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাসির বলেন, প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি গঠনের বিষয়েও আমরা নির্দেশনা দিয়েছি। আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিটি গঠন করার।
মো. তাসনিম হক রাফি/অন্তরা