নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে বেইলি সেতু। এই সেতু দিয়েই প্রতিদিন বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে, স্থানীয়রা হেঁটে পারাপার হন। কিন্তু সেতুতে উঠতেই পথচারীসহ যানবাহনের যাত্রীদের মনে ভীতি তৈরি হয়। কোনো যান উঠলেই সেতুটি কাঁপতে থাকে। এ ছাড়া পাটাতন ভেঙে সৃষ্টি হওয়া গর্তগুলো আতঙ্কের কারণে হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেইলি সেতুটির অবস্থান ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার পোড়াবাড়ী বাজারে। ঝুঁকিপূর্ণ এই সেতুটি এখন স্থানীয়দের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। এই কাটার ব্যথা সারাতে উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। স্থানীয়দের ভোগান্তি নিরসনে পাশেই আরেকটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। সবার অপেক্ষায় ছিল– কবে হবে নতুন সেতু। কবেই বা ঝুঁকি ছাড়া গন্তব্যে যাওয়া যাবে। কিন্তু নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তেই জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়, যা আজও কাটেনি। ফলে এলাকাবাসীর নতুন সেতুর স্বপ্ন ধীরে ধীরে ফিকে হতে থাকে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বেইলি সেতুটির অনেক অংশের পাটাতন ভেঙে গেছে। কোনো রকমে ছোট যানবাহনগুলো চলাচল করছে। বিভিন্ন বয়সী পথচারীসহ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সেতুটি পারাপার হচ্ছেন। সেতুটির পাশেই নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হওয়া আরেকটি সেতু দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ওই সেতু থেকে মূল সড়কে ওঠানামার জায়গাটি এখনো অধিগ্রহণ করা হয়নি। এতে নতুন সেতুটি কোনো কাজে আসছে না।
স্থানীয়রা জানান, খিরু নদীর এক পাশে ত্রিশাল উপজেলা, অন্য পাশে ফুলবাড়িয়া। এই নদীর ওপর আশির দশকে বেইলি সেতুটি নির্মিত হয়েছিল। তিন যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়া সেতুটি যানবাহনের ভার আর সইতে পারছে না। চার বছর আগে এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এলজিইডি বেইলি সেতুটির পাশেই নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসন না হওয়ায় দেড় বছর ধরে সেতুটির নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে দুই উপজেলার লাখো মানুষকে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নড়বড়ে সেতুটি পার হতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বেইলি ব্রিজের পাশেই প্রায় ৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রকল্পটির কাজ পায় এমসিই-এমএলএম (জেভি) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কাজ শুরু হয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় দুই দফা সময় বাড়িয়েও কাজ শেষ হয়নি।
মঠবাড়ী ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী তানিয়া বলে, ‘এই সেতুতে ওঠার পরই ভয় লাগতে শুরু করে। মনে হয় এই বুঝি সেতুসহ নিচে পড়ে যাব। তবু আতঙ্ক নিয়ে নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। জনদুর্ভোগ লাঘবে পাশে নির্মিত সেতুটি দ্রুত চলাচলের উপযোগী করা প্রয়োজন।’
মকবুল হোসেন নামে স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভাঙাচোরা বেইলি সেতুটি পারাপার হতে গিয়ে পায়ে কয়েকবার ব্যথা পেয়েছি। মাঝেমধ্যে অটোরিকশা উল্টে যায়। ভাঙা পাটাতনে পড়ে অনেকেই আহত হন। তবুও পাশের সেতুটি চলাচলের উপযোগী করা হচ্ছে না। আমাদের দুর্ভোগ কেউ গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করছে না।’
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুল-কলেজে যেতে বা নদী পারাপারে বেইলি সেতুটিই একমাত্র মাধ্যম। এই সেতুটি অনেক দুর্ঘটনার সাক্ষী। দ্রুত জমি অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসন করে নতুন সেতু চালুর দাবি জানাচ্ছি।’
জানা গেছে, অধিগ্রহণ জটিলতায় রয়েছে সাড়ে ১৯ শতাংশ জমি। প্রতি শতাংশ জমির মূল্য দাবি করা হয় ২৫ লাখ টাকা। ওয়ারিশানসহ জমির মালিক ২০-২২ জন। তাদের একজন বাসন্তী রানী চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণে আমার তিন শতকের ভিটা পড়েছে। অধিগ্রহণের টাকা পাইনি। টাকা না পাওয়া পর্যন্ত জমি ছাড়া হবে না।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মকবুল হোসেন বলেন, ‘প্রায় ১৯ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে অল্প সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে।’
এ বিষয়ে এলজিইডির ত্রিশাল উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন বলেন, ‘জমি, স্থাপনা (বাড়িঘর) ও গাছের দাম নির্ধারণ করতে হবে। বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা মাপ নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন। সেখানকার কার্যক্রম শেষ হলেই অবশিষ্ট কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। ইতোমধ্যে সেতুর ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।’