প্রযুক্তির জোয়ার আর নেট দুনিয়ার বিনোদনের ভিড়ে ফিকে হতে বসেছে গ্রামীণ মেলার চিরায়ত জৌলুশ। তবু বাঙালির প্রাণের টানে টিকে আছে বৈশাখী উৎসব। এই আবহমান ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন চত্বরে ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে সাত দিনব্যাপী এ বৈশাখী মেলা। তবে এই মেলাকে ঘিরে আনন্দের চেয়েও কারুশিল্পীদের মনে এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দুশ্চিন্তা।
সোনারগাঁ জাদুঘর প্রাঙ্গণের কারুপল্লি ঘুরে দেখা যায়, জামদানি, নকশিকাঁথা, শোলাশিল্প ও বাঁশ-বেতশিল্পের কারিগররা ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে শতরঞ্জি, নকশি হাতপাখা, কাঠের খোদাই করা পণ্য ও লোক-বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু এই ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে আছে কারুশিল্পীদের দীর্ঘশ্বাস।
নকশিকাঁথা শিল্পী হোসনে আরা জানান তার কষ্টের কথা। একসময় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তার হাতের কাজের খোঁজে আসতেন। কিন্তু এখন বাজার সয়লাব মেশিনে তৈরি সস্তা পণ্যে। হোসনে আরা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগের বৈশাখ ছিল অন্য রকম। এখন হাতে তৈরি পণ্য কেউ নিতে চান না। খুব কষ্টে জীবন কাটছে।’
বেতশিল্পের কারিগর পরেশ চন্দ্র দাস ৫৪ বছর ধরে সোনারগাঁয়ের প্রতিটি মেলায় অংশ নিচ্ছেন। ঝুড়ি, দোলনা, রিকশা ও নৌকার প্রতিকৃতি তৈরি করেন। তিনি জানান, আগে প্রকৃতি থেকে বেত সংগ্রহ করা যেত, এখন তা কিনে আনতে হয়। পরেশ বলেন, ‘পরিশ্রমের তুলনায় লাভ অনেক কম। তবে আশার কথা হলো, ইদানীং অনলাইনে দেশি পণ্যের চাহিদা বাড়ায় এই শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’
জামদানিশিল্পী আবু তাহেরের কণ্ঠেও হতাশা। তিনি জানান, মেলায় জামদানি শাড়ি নিয়ে বসবেন ঠিকই, কিন্তু বিক্রি নিয়ে শঙ্কিত। ভারতীয় শাড়ির দাপটে দেশি জামদানির কদর দিন দিন কমছে বলে দাবি তার।
নওগাঁর আত্রাই থেকে আসা শোলাশিল্পী নয়ন মালাকার ও নিমাই মালাকাররা বংশপরম্পরায় এই কাজ করছেন। তারা জানান, আগে ধানের জমি থেকে শোলা সংগ্রহ করা যেত, এখন চড়া দামে কিনতে হয়। তেঁতুলের বিচির আঠা, বাঁশ আর সুতা দিয়ে তৈরি তাদের নিপুণ কারুকাজের কদর আগের মতো নেই।
কারুশিল্পীদের অভিযোগ, সরকারি উদ্যোগে লোকজ পণ্যের কোনো স্থায়ী বাজার এখনো তৈরি হয়নি। এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কারুপণ্য কিনলেও শিল্পীরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। ফলে অনেক শিল্পীই তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে এই পেশায় আনতে অনাগ্রহী।
বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দেশজ লোক ও কারুপণ্যের প্রচার ও বাজারজাতকরণের একটি বড় ক্ষেত্র হলো এই বৈশাখী মেলা। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। এবার সাত দিনব্যাপী এই মেলায় দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা শিল্পীদের উৎপাদিত পণ্য সর্বসাধারণের সামনে তুলে ধরার বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’