গভীর সমুদ্রে ভাসছে বিশাল বয়া। মাটির নিচে ২২০ কিলোমিটারের অত্যাধুনিক পাইপলাইন আর পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীতে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল সব স্টোরেজ ট্যাংক। জ্বালানি খাতে আধুনিকতার এই ‘দরজা’ এখন তালাবদ্ধ। প্রায় ৮ হাজার ২২২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং’ (এসপিএম) প্রকল্পটি কাজ শেষ হওয়ার পরও অপারেটর নিয়োগের জটিলতায় অলস পড়ে আছে। ফলে আধুনিক তেল খালাস ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় দেশ একদিকে যেমন বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের সুযোগও হাতছাড়া হচ্ছে।
২০১৫ সালে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পটি ২০২৪ সালে নির্মাণ শেষ হলেও এখনো বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারেনি। ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের বেশির ভাগ অর্থায়ন হয়েছে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে। নির্দিষ্ট সময়ে এই ঋণের কিস্তি ও সুদসহ পরিশোধের চাপ থাকলেও প্রকল্প থেকে কোনো আয় আসছে না।
বর্তমানে সমুদ্র থেকে বড় জাহাজে তেল এনে ছোট জাহাজে (লাইটার ভেসেল) স্থানান্তর করে চট্টগ্রাম ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নেওয়া হয়। এই মান্ধাতা আমলের পদ্ধতিতে ১ লাখ টন তেল খালাস করতে সময় লাগে ১০ থেকে ১১ দিন। অথচ এসপিএম চালু হলে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় একই পরিমাণ তেল খালাস করা সম্ভব। বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। বছরে ৯০ লাখ টন ক্রুড অয়েল ও ডিজেল খালাস করা যাবে।
মহেশখালীর ৬টি ট্যাংকে ২ লাখ ১ হাজার টন তেলের বিশাল মজুত গড়ে তোলা সম্ভব, যা বৈশ্বিক এ সংকটের সময় ‘ঢাল’ হিসেবে কাজ করবে। সূত্রমতে, প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ আটকে আছে প্রশাসনিক জটিলতায়। শুরুতে বিশেষ আইনের আওতায় দরপত্র ছাড়াই এটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত থাকলেও পরে তা বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণেই আজ ৮ হাজার কোটি টাকার সম্পদ পৃথিবীর এই জ্বালানিসংকট মুহূর্তে এক প্রকার ‘ঘুমিয়ে’ আছে।
প্রকল্প পরিচালক নাহিদ জামান জানান, কারিগরি ও লজিস্টিক কিছু সমস্যার কারণে দেরি হচ্ছে। তবে ২০২৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে তেল মজুত করে সফলতা যাচাই করা হয়েছে। চলতি বছরেই এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, এটি জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এটি চালু হলে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকার কাজ হলেও এর কোনো সুফল তারা পাচ্ছেন না। প্রকল্পের কারণে কর্মসংস্থান ও এলাকার উন্নয়নের যে স্বপ্ন তারা দেখেছিলেন, তা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শেখ আবদুল্লাহ বলেন ‘বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে যখন জ্বালানি খরচ সাশ্রয় করা জরুরি, তখন এমন একটি আধুনিক প্রকল্প ফেলে রাখা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় অপচয়। দ্রুত অপারেটর নিয়োগ দিয়ে এসপিএম সচল করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’
জ্বালানি খাতের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ এখন কেবল একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মেঘ কেটে গেলে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং’ কেবল একটি পাইপলাইন বা স্টোরেজ ট্যাংক হয়ে থাকবে না; বরং এটি হবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি।
এই মেগা প্রকল্প চালু হলে পূর্ণাঙ্গভাবে উত্তাল সমুদ্রে লাইটার ভেসেলের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হবে না; সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পৌঁছাবে রিফাইনারিতে। এতে একদিকে যেমন কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে মহেশখালীর এই ‘এনার্জি হাব’ স্থানীয় অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে এই অগ্রযাত্রা বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় এক নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে।