চারপাশ অন্ধকার। মুখ থেকে বের হচ্ছিল সামান্য আলো! তাতেই জুতা সেলাইয়ের কাজ করছিলেন পরেশ। কাছে যেতে দেখা গেল হাতের মোবাইলফোনটি মুখ দিয়ে কামড়ে ধরে রেখেছেন। সেই আলোতেই জুতা সেলাই করছিলেন।
সিলেট নগরীর আখালিয়া এলাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালের সামনে এভাবেই সন্ধ্যাকালীন লোডশেডিংয়ে কাজ করেন পরেশ। তিনি জানান, সন্ধ্যার পর তার এখানে কিছু গ্রাহক আসেন। আর তখনই লোডশেডিং বেশি হয়।
পরেশ বলেন, ‘কারেন্টের (বিদ্যুৎ) কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই, কেমনে চলি কইন (বলুন)! ঘণ্টায় আয়, ঘণ্টায় যায়। কিন্তু কাম-কাজ তো বন্ধ করা যায় না। মোবাইলের লাইটে কাম করতে গিয়া মাথা আইন্ধার অইযায় (অন্ধকার হয়ে যায়)!’
কেবল পথের ধারের পরেশ একা নন, নিম্নআয়ের প্রায় সব মানুষই লোডশেডিংয়ের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন। সিলেট নগরীর বিভিন্ন প্রান্তের আবাসিক এলাকায় দিনে ও রাতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে। এর মধ্যে সন্ধ্যাকালে লোডশেডিং নিয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়। নগরবাসীর প্রশ্ন, সন্ধ্যা ৭টার পর বিপণিবিতানসহ দোকানপাট বন্ধ থাকে। তখন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা। কিন্তু তারপরও লোডশেডিং কেন হয়?
যদিও নগরবাসীর এমন প্রশ্নের জবাব বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে নেই। চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়ায় সিলেটে গত ১৭ এপ্রিল থেকে ৪০ শতাংশ লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশজুড়েই এই সমস্যা হচ্ছে। সিস্টেম টিকিয়ে রাখতে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়ায় বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে অফিস-আদালত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব পড়েছে। আর অতিরিক্ত গরমের কারণে দুর্ভোগের পরিমাণ আরও বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রেস্তোরাঁ, কফিশপ, ফাস্টফুডসহ বিভিন্ন খাবার দোকানের ব্যবসায়ীরা।
নগরীর কুমারপাড়া, নয়াসড়ক, জিন্দাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার খাবার ব্যবসায়ীরা জানান, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সবকিছু বন্ধ হওয়ার কারণে খাবারের দোকানে ক্রেতা অনেক কম। তার মধ্যে স্বল্প সংখ্যক ক্রেতারা রেস্তোরাঁয় এলেও বিদ্যুৎ না থাকার কারণে তাদের অর্ডার ঠিকমতো সরবরাহ করা যায় না। কারণ ভালো মানের রেস্তোরাঁগুলোয় খাবার তৈরি হয় বিদ্যুৎচালিত মেশিনারিজ দিয়ে। দেখা যায় গ্রাহক অর্ডার করেছেন আর বিদ্যুৎ চলে যায়। এক থেকে দেড় ঘণ্টার লোডশেডিং হয়। তখন গ্রাহকরা অর্ডার করেও চলে যান।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ১৫ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টায় সিলেটে পিডিবির চার জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২২৫ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১৮৫ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ৪০ শতাংশ। এছাড়া লোডশেডিং কত ঘণ্টা হবে এটা আগে ঠিক করা যায় না। কারণ যদি পাওয়ার প্লান্ট বন্ধ থাকে বা কিছু সমস্যা হয় তখন লোডশেডিং করতে হয়। আবার চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম থাকলে লোডশেডিং করতেই হয়। কারণ তখন সিস্টেম টিকিয়ে রাখতে হয়, তা না হলে কান্ট্রিওয়াইজ ব্ল্যাক আউট হয়ে যাবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন বলেন, ‘কী পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে আর কী পরিমাণ ঘাটতি আছে সেটা আমার জানার সুযোগ নেই। আমি প্রতি ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীদের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। তবে যেহেতু বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে এলএনজি ব্যবহার করা হয় এবং সেটাও বাইরে থেকে কিনতে হয়। জ্বালানি তেলও আসতে পারছে না। এসব ক্রাইসিসের কারণে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেজন্য আমাদের লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতেও যাতে সমতা রক্ষা হয় এ জন্য লোড ম্যানেজমেন্টও করতে হয়।’
এদিকে, সিলেট নগরীতে সন্ধ্যাকালীন লোডশেডিং কমাতে গত ২০ এপ্রিল বিদ্যুৎ বিভাগকে নিয়ে সভা করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন। সভায় লোডশেডিং কমানোর আশ্বাস দিয়েছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ বিবেচনায় বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত লোডশেডিং না করে অন্য সময় সমন্বয়ের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।