পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীতে দুই মাসের মাছ ধরা নিষিদ্ধকালীন সময়ে কর্মহীন জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি মানবিক সহায়তার চাল বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দুই মাসে নিবন্ধিত জেলে প্রতি ৮০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও ৫ কেজি করে চাল কম পেয়ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এছাড়াও জেলেদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে টাকা আদায়, প্রকৃত জেলেদের বঞ্চিত করা, বরাদ্দ ছাড়ের দুই মাস পর চাল বিতরণ এবং ট্যাগ অফিসারের অনুপস্থিতিতে চাল বিতরণের মতো একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল বশার মৃধার বিরুদ্ধে।
গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ও শনিবার (২৫ এপ্রিল) চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের জেলেদের মাঝে চাল বিতরণের সময় এসব অভিযোগ সামনে আসে।
জেলে ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ইলিশের অভয়াশ্রম তেঁতুলিয়া নদীতে মার্চ ও এপ্রিল এই দুই মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় কর্মহীন জেলেদের জন্য সরকার মাসে ৪০ কেজি করে দুই মাসে মোট ৮০ কেজি চাল বরাদ্দ দেয়। উপজেলার ৬ হাজার নিবন্ধিত জেলের অনুকূলে ৪৮০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৫৫ জন জেলের জন্য ১১৬ দশমিক ৪০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি চাল উত্তোলন ও বিতরণের ছাড়পত্র দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময় ২৬ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে দুই মাস পর চাল বিতরণ করা হয়।
শুক্রবার (২৫এপ্রিল) ইউনিয়নের ৪, ৬ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড এবং শনিবার ৫, ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে চাল বিতরণ করা হয়। পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, দুই দিনে মোট ১ হাজার ২০০ জেলের মধ্যে চাল বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডে পরবর্তীতে বিতরণ করা হবে।
চাল বিতরণে দেখা যায়, প্রতি দুই জন জেলের মাঝে ৫০ কেজির তিন বস্তা (মোট ১৫০ কেজি) চাল দেওয়া হচ্ছে। অথচ বরাদ্দ অনুযায়ী দুই জন জেলের পাওয়ার কথা ১৬০ কেজি। এতে করে প্রতিজন জেলে ৫ কেজি করে চাল কম পাচ্ছেন।
৮ নম্বর ওয়ার্ডের জেলে নান্নু মিয়া বলেন, দুই মাসে ৮০ কেজি চাল পাওয়ার কথা, কিন্তু আমাদের দেওয়া হয়েছে ৭৫ কেজি। বাকি চাল নাকি অন্যদের দেওয়া হবে।
এদিকে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. জসিম হোসেনের বিরুদ্ধে জেলেদের কাছ থেকে পরিবহন খরচ বাবদ ১০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে তার আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে চাল বিতরণের অভিযোগ রয়েছে।
৪ নম্বর ওয়ার্ডের জেলে হেলাল হাওলাদার বলেন, জসিম মেম্বার প্রকৃত জেলেদের নাম ব্যবহার করে তার ভাইসহ আত্মীয়দের মধ্যে চাল দিয়েছেন। তারা জেলে না, তারপরও চাল পেয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মনির জানান, চাল গুদাম থেকে ট্রলারে আনার খরচ দেখিয়ে প্রতি জেলের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য জসিম হোসেন মৃধা বলেন, যে চাল কম দেওয়া হয়েছে, তা অন্য জেলেদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। টাকা নেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা।
অন্যদিকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য অনুপস্থিত থাকায় সংরক্ষিত নারী সদস্য মোসা. আছমা বেগমের স্বামী রিপন খান ১২০ জন জেলের মধ্যে চাল বিতরণ করেন। তার বিরুদ্ধেও প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে ব্যবসায়ী, কৃষক ও অন্যান্য পেশার লোকদের মধ্যে চাল বিতরণের অভিযোগ উঠেছে।
৬ নম্বর ওয়ার্ডের কার্ডধারী জেলে সবুজ হাওলাদার, জাফর ফরাজী, মাহাবুল হাওলাদার, কামাল, রেজাউল, জসিম খান, বেল্লাল হাওলাদার, সিদ্দিক মৃধাসহ অনেকেই বলেন, আমাদের কার্ড আছে, আমরা প্রকৃত জেলে তারপরও চাল পাইনি।
অভিযোগ অস্বীকার করে রিপন খান বলেন, যাদের নাম ছিল তাদেরই চাল দেওয়া হয়েছে। তবে ৫ কেজি কম দেওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
ইউনিয়ন পরিষদ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান এনামুল হক আত্মগোপনে চলে যান। তার অনুপস্থিতিতে প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান আবুল বশার মৃধা। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সূত্রগুলো দাবি করে, ৮০ কেজির পরিবর্তে ৭৫ কেজি করে চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ১ হাজার ৪৫৫ জন জেলের হিসাবে মোট ৭ দশমিক ২৭৫ মেট্রিক টন চাল কম দেওয়া হয়েছে, যা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল বশার মৃধা বলেন, বরাদ্দের তুলনায় জেলের সংখ্যা বেশি। তাই ৫ কেজি করে কম দিয়ে বাকি চাল অন্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
ট্যাগ অফিসারের অনুপস্থিতিতে চাল বিতরণের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ট্যাগ অফিসার বলতে পারবেন। ট্রলার সংকটের কারণে চাল আনতে দেরি হয়েছে।
চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার ও উপজেলা বিআরডিবি কর্মকর্তা বাসুদেব সরকার বলেন, দুই মাস পর চেয়ারম্যান চাল বিতরণের সিদ্ধান্ত নেন। সাপ্তাহিক ছুটির কারণে আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি। অন্যদিন বিতরণের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা মানা হয়নি।
ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহাদী আমিন বলেন, নিবন্ধিত জেলে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন, কিন্তু বরাদ্দ পেয়েছি ১ হাজার ৪৫৫ জনের জন্য। তাই ৫ কেজি করে কম দিয়ে বাকি জেলেদের মধ্যে সমন্বয় করা হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটিই বিতরণ করতে হবে। ৫ কেজি করে কম দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিলন/অন্তরা