সিলেটের চার উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত বাসিয়া নদী। সুরমা থেকে উৎপত্তি হয়ে এটি মিশছে কুশিয়ারা নদীতে। উৎসমুখ সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের মাশুকগঞ্জ বাজারে। ১৯৭৭ সালে এখানে প্রথম খননকাজ শুরু হয়, যার উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
সেই খননের পর কৃষিক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছিল। সেচ সুবিধার কারণে ‘বাইয়ারপাড়ে চাষবাস’ ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ হয়। নদীতীরের অনাবাদি জমিসহ বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের ফসল উৎপাদন বাড়ে। সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা, ওসমানীনগর ও বিশ্বনাথ উপজেলার বরাক, চাউলধনী, ছালীয়া, মউডুবী ও দয়ালং হাওরের প্রায় ১০ হাজার হেক্টর কৃষিজমির সেচসংকট প্রাকৃতিকভাবেই দূর হয়। তবে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলে খননের ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। ফলে চাষাবাদে সংকট দেখা দেয়। নদীটিও দখল-দূষণে মৃত খালে রূপ নেয়।
প্রায় ৪৯ বছর পর এবার সরকারপ্রধানের হাতে নদী খননের পরিকল্পনার সূচনা হতে চলেছে। আগামী ২ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খননকাজের উদ্বোধন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে বাইয়ারপাড় এলাকায় যেন ফিরে এসেছে ৪৯ বছর আগের সেই আনন্দ।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, উদ্বোধনের পর নদীর প্রায় ২৩ কিলোমিটার অংশ খনন করা হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং শিল্প-বাণিজ্য, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ২৪ এপ্রিল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী জানান, মাশুকগঞ্জ বাজার থেকে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পর্যন্ত খননকাজ চলবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৯০ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
সেই খনন স্মৃতির ৩ সাক্ষী
প্রায় ৪৯ বছর আগের সেই খনন স্মৃতির সাক্ষী বাইয়ারপাড়ের আরব আলী (৭৫)। তরুণ বয়সের সেই দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে তার চোখমুখ জ্বলজ্বল করছিল। পরনে সাদা গেঞ্জি, মাথায় ক্যাপ, হাতে কোদাল। এই বেশে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজে যখন খননকাজে নেমে পড়েন, তখন উৎসাহে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার সঙ্গে হাত মেলান আশপাশের মানুষও। এ বর্ণনায় আপ্লুত আরব আলী বলেন, ‘তাইন (রাষ্ট্রপতি) মাটি কাটরা (খনন) দেইখা আমরাও হাত লাগাইছি। আমার ছোট ভাইরে মাথায় হাত দিয়া মায়া করছইন (আদার করেছেন)। একটা গেঞ্জি গাউত (শরীরে), মাথায় টুপি। পয়লা দেইখা আমরা কেউ বুঝতাই পারছি না, এইন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান!’
আরব আলীর পাশে থাকা একই বয়সী শায়েস্তা মিয়াও ফিরে যান সেই স্মৃতিতে। তিনি জানান, সেই খননের পর বাইয়ারপাড়ের চাষবাস দেখতে পরের বছর ১৯৭৮ সালে দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এসেছিলেন। শায়েস্তা মিয়া বলেন, ‘তাইনযে (প্রধানমন্ত্রী) তাইনের বাবার স্মৃতির পুনর্জাগরণ নিজ হাতে কররা, আমরা সব খুব খুশি, খুব আনন্দের!’
তারা তাদের দেখার স্মৃতি থেকে বলেছেন, ১৯৭৭ সালের নভেম্বর মাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে প্রথম দফা খনন হয় বাসিয়া নদীর মুখ। এরপর দ্বিতীয় দফা ১৯৭৮ সালের জুন মাসে। তখন খনন এলাকায় একটি জনসভাও করেছিলেন। এরপর সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও তখনকার স্থানীয় সংসদ সদস্য খন্দকার আব্দুল মালিক (বর্তমান শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের বাবা) খননের কার্যকারিতা অব্যাহত রাখেন।
খননের পর জনসভার প্রত্যক্ষদর্শী পূর্বদশা জামে মসজিদের মোতাওয়াল্লি আয়ুব আলী জানিয়েছেন, খনন শেষে আরও কিছু কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ‘এখানে একটা স্লুইসগেট চাই। যে ব্রিজটা এখন আছে, সেটা খুবই ছোট। এটা বড় করার দাবি আমাদের।’
টমেটো বিক্ষোভ-কৃষক প্রার্থনা!
বাসিয়া নদী প্রায় ৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। মরা নদীর ভরা অতীতের মতো একসময়ের প্রমত্তা এই নদী ধারাবাহিকভাবে খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক জায়গায় নাব্য হারিয়ে ফেলে। ফলে স্থানীয়দের অনেকে এখন বাসিয়াকে নদীর বদলে খাল বলেই চেনেন। তিন উপজেলার পাঁচটি হাওরসহ আরও দুটি উপজেলার নদীর দুই তীরের জমি ছিল ধানসহ সবজি চাষের উপযোগী। কৃষিক্ষেত্রে ‘বাইয়ারপাড়ের চাষবাস’ আলাদা খ্যাতিও পায়। সেই খ্যাতি দমিয়ে রাখতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও ছিল। এতে করে দখল-দূষণে আস্ত এক নদী এখন খালে পরিণত হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালের দিকে ‘বাসিয়া খনন’ দাবিকে জনদাবিতে রূপান্তর করে কৃষকদের একটি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ‘সিলেট কৃষক কল্যাণ সংস্থা’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তুলে অনেকটা বিদ্রুপাত্মক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক আবদুল হান্নান আনছারী। প্রথম কর্মসূচি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। সবজির দাম কমে যাওয়ায় বাইয়ারপাড়ে একটি সবজি সংরক্ষণাগার (কোল্ড স্টোরেজ) স্থাপনের দাবিতে টমেটো-বিক্ষোভ করেছিলেন চাষিরা। ওই বছরের ৯ মার্চ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সবজি চাষিদের ফলন করা টমেটো ফেলে দিয়ে বিক্ষোভ করলে বিষয়টি আলোচনায় আসে।
এরপর ১৭ এপ্রিল বাসিয়া নদী খননের দাবিতে বাইয়ারপাড়ে ‘কৃষকের প্রার্থনা’ শীর্ষক একটি চাষি সমাবেশ হয়। সেখানে প্রার্থনার মতো করে পাঠ করা লিখিত দাবিনামা প্রস্তুত করেছিলেন আব্দুল হান্নান আনছারী। তার এই তৎপরতার সূত্র ধরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি স্টাডি সম্পন্ন হয়েছিল। ‘সংকটে বাইয়ারপাড়ের চাষাবাদ’ শীর্ষক সেই গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে একটি সেমিনার হওয়ার প্রাক্কালে আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন কৃষক অন্তঃপ্রাণ আবদুল হান্নান আনছারী। তার মৃত্যুতে নেতৃত্বের শূন্যতায় থেমে যায় বাইয়ারপাড়ে সেই কৃষক আন্দোলন।
দখল-দূষণ থেকে ‘বাঁচাও বাসিয়া’
এরপর দখল ও দূষণ নিয়ে বিশ্বনাথ উপজেলা সদর থেকে সোচ্চার হয় আরেকটি সংগঠন। ‘বাঁচাও বাসিয়া নদী ঐক্য পরিষদ’ নামের সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক ফজল খান বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা দখল ও দূষণ লালন করছেন। আমরা ২০১১ সালে বাসিয়া নাট্য সংগঠনের নামে ঐক্যবদ্ধ হই। এরপর বাসিয়া নদী খননে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্প নিলে বাসিয়া বাঁচাও ঐক্য পরিষদ গঠন করে দখল ও দূষণ ঠেকানোর আহ্বান জানাই। কিন্তু একের পর এক তালিকা ও উচ্ছেদ প্রস্তুতির পরও বাসিয়া দখলমুক্ত হয়নি।’
বিশ্বনাথ উপজেলা সদর অংশে নদীর দুই তীর দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। কোথাও নদীর ভেতরেই মাটি ভরাট করে বসতঘর ও দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় ২০০ মিটার প্রশস্ত নদীটি সংকুচিত হয়ে অনেক স্থানে কয়েক ফুটে নেমে এসেছে। বর্ষা মৌসুমেও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসে না। আর শুকনো মৌসুমে হেঁটে পার হওয়া যায় নদীর একপাড় থেকে অন্যপাড়ে। রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে উৎসমুখে খনন কর্মসূচিতে স্বস্তি প্রকাশ করে নদীসংগ্রামী ফজল খান বলেন, ‘নদীর উৎসমুখ যদি সচল হয়, সেখানে সুরমার সঙ্গে সংযোগ অংশ যদি সচল হয়, তাহলে বাসিয়া তার নামের মতো জলে ভেসে দখল-দূষণ তাড়াবে বলে মনে করি।’
সুফলবিহীন প্রকল্প
টমেটো-বিক্ষোভ, কৃষক প্রার্থনার মতো বিদ্রুপাত্মক কর্মসূচি পালনের দেড় দশক আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জলবায়ু তহবিলের মাধ্যমে ২০১৪ সালের দিকে বাসিয়ার উৎসমুখে কিছু খনন করেছিল। এরপর ২০১৮ সালে আরেক দফা। কিন্তু নদী সেই রূপ ফিরে পায়নি। বাইয়ারপাড়ের চাষিদের সংকটও কাটেনি।
পাউবো সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে জলবায়ু তহবিলের অর্থায়নে নদীর উৎসমুখে আংশিক খনন করা হয়। ২০১৮ সালে আরেক দফা কাজ হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। তৎকালীন প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সুরমা নদীর মুখ থেকে কামালবাজার সেতু পর্যন্ত চার কিলোমিটার খনন করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এতে ৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানি নিষ্কাশন সহজ হওয়ার পাশাপাশি বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন অতিরিক্ত ধান উৎপাদনের কথা ছিল।
তবে বাস্তব সুফল সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি পাউবো সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস। তিনি জানান, নতুন প্রকল্পে নদীর ২৩ দশমিক ২৫ কিলোমিটার অংশ খনন করা হবে। দরপত্র প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তার আশা, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরই প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে।