চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের নাম ভাঙিয়ে দক্ষতা উন্নয়নের নামে তিন শতাধিক যুবকের কাছ থেকে ১০ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ড্রাইভিং ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণের প্রলোভন দেখিয়ে এবং সরকারি অফিসের কক্ষ ব্যবহার করে এই প্রতারণা চালানো হয়। বর্তমানে ভুক্তভোগীরা সার্টিফিকেট বা টাকা না পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আনোয়ারা উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নামে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে মাসব্যাপী ড্রাইভিং, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের জন্য বিজ্ঞাপন প্রচার করলে ভুক্তভোগীরা সেখানে ভর্তি হন। এ সময় উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কার্যালয়ের একটি কক্ষে অফিস খুলে প্রতিজন থেকে ১৪ হাজার ১০০ টাকা করে কোর্স ফি নেওয়া হয়। প্রতি ব্যাচে ২০ থেকে ২৫ জন করে প্রশিক্ষণার্থীও ভর্তি করা হয়। কিছুদিন প্রশিক্ষণের পর অফিসে তালা ঝুলিয়ে তারা পালিয়ে যায়। এমনকি তাদের মুঠোফোনও বন্ধ করে দেন।
ভুক্তভোগী কর্ণফুলীর শিকলবাহা এলাকার মোহাম্মদ আতিক বলেন, ‘আনোয়ারা উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাইট থেকে বিজ্ঞপ্তি পেয়ে গাড়ির ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের জন্য সেখানে ভর্তি হয়েছিলাম। সমাজসেবা অফিসে এক মাস আমাদের ক্লাসও করান এম এ লতিফ নামে একজন প্রশিক্ষক। আমাদের ব্যাচে ২০ থেকে ২৫ জন জনপ্রতি ১৪ হাজার ৫৭৫ টাকা করে দিয়েছি। পরিচালক মো. আতাউল্লাহ মনির টাকা নেওয়ার পর থেকে সমাজসেবা অফিসের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে তারা পালিয়ে গেছেন। আমাদের পরীক্ষাও নেননি, সার্টিফিকেটও দেননি। এ ঘটনায় আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’
কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার বৈরাগ ইউনিয়নের উত্তর গুয়াপঞ্চক এলাকার মোহাম্মদ জাবের, মোহাম্মদ আবেদ নূরসহ আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার প্রায় শতাধিক যুবক।
মোহাম্মদ জাবের বলেন, ‘ভর্তির সময় ছয় হাজার ১০০ টাকা করে নেয় তারা। কিছুদিন ক্লাস করানোর পর থেকে বন্ধ রয়েছে। যাদের কক্ষে ক্লাস হতো তারাও বলতে পারছে না কোথায় গেছে।’ অপর শিক্ষার্থী আবেদ নূর বলেন, ‘দক্ষতা অর্জনের আশায় কম্পিউটার প্রশিক্ষণের জন্য ৩ হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হই। কোথায় ক্লাস, পরীক্ষা আর সার্টিফিকেট, কোনো কিছুর ঠিক নেই। কক্ষে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে গেছেন প্রশিক্ষকসহ পরিচালক। এখন যারা পাশের কক্ষে রয়েছে, তারা বলছেন—তাদের সঙ্গে নাকি কোনো সম্পর্ক নেই। আর আমরা বিপাকে পড়েছি।
মোহাম্মদ নূর মিয়া নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে প্রশিক্ষণ ও তাদের কক্ষে এসব কার্যক্রম চলত। এখন তালা ঝুলিয়ে তারা দায়সারা কথা বলছেন। মানুষ বিশ্বাস করে তাদের সন্তানদের দক্ষতা অর্জনের জন্য পাঠিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছে। প্রশাসনের উচিত সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।’
সমাজসেবা অফিস সূত্র জানায়, ২০১৯ সাল থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি কক্ষে লোগো ও সাইনবোর্ড ব্যবহার করে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র মো. আতাউল্লাহ মনির নামে এক ব্যক্তি প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছিলেন। তাদের সঙ্গে তৎকালীন সমাজসেবা কর্মকর্তার সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছিল, যেটার মেয়াদ ২০২২ সালের দিকে শেষ হয়ে যায়। এরপর ধারাবাহিকভাবে কার্যক্রম চললেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে পালিয়ে যান এ ব্যক্তি। এরপর থেকে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বন্ধের পর থেকে তাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণের জন্য টাকা দেওয়া প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী সার্টিফিকেট প্রদান, টাকা ফেরতসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
দক্ষতা উন্নয়নের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে টাকা নিয়ে ক্লাস না করা, সার্টিফিকেট প্রদানসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী মো. এমরান, শরৎ দত্ত, মোহাম্মদ আতিক, মো. মানিক, মো. রায়হান নামে কয়েকজন যুবক গত ১৯ এপ্রিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে এখনো এর কোনো সুরাহা মিলেনি বলে অভিযোগ তাদের।
জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রিজোয়ান উদ্দিন বলেন, ‘সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি কক্ষে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নামে যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। গত ডিসেম্বর মাসে তাদের সব কার্যক্রম বন্ধ করে চলে যায়। এরপর থেকে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আসতে থাকে। বিষয়টি আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ আতাউল্লাহ মনিরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, ‘ঘটনাটি জেনেছি। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’