একসময় বর্ষা এলেই নদীর বুক ভরে উঠত টইটম্বুর পানিতে। শীত-গ্রীষ্মেও থাকত স্রোতের ছন্দ। নদীর পানিতেই চলত কৃষকের সেচ, জেলেদের জীবিকা আর গ্রামের জনজীবন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই নদীগুলোই এখন অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।
দখল, দূষণ, অবৈধ বাঁধ, পলি জমে ভরাট ও দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় রাজশাহীর অসংখ্য নদ-নদী এখন মৃতপ্রায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজশাহীজুড়ে নদী রক্ষার প্রশ্ন এখন শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়, এটি কৃষি ও অর্থনীতির জন্যও বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ৪০টিরও বেশি নদী ও খাল বর্তমানে দখল ও দূষণের কারণে অস্তিত্বসংকটে রয়েছে। অথচ দুই যুগ আগেও এসব নদীতে ছিল পর্যাপ্ত নাব্য ও স্বাভাবিক প্রবাহ।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় একসময় কৃষির প্রাণ ছিল বারানই, মুসাখা ও নারোদ নদী। বর্ষায় নদী উপচে পড়ত, সেই পানি দিয়েই সারা বছর চলত চাষাবাদ। এখন সেই নদীগুলোর অধিকাংশ জায়গা ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও নদীর বুকজুড়ে বালু ও আগাছা, কোথাও আবার চলেছে প্রভাবশালীদের দখল।
শিলমাড়িয়ার সাধনপুর এলাকায় বারানই নদী, জিউপাড়ার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মুসাখা এবং বানেশ্বরের বালিয়াঘাটি-রঘুরামপুর এলাকার নারোদ নদী এখন অনেক জায়গায় শুধু নামেই আছে। বাস্তবে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে স্রোত প্রায় বন্ধ।
ফলে কৃষকদের সেচব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে নদীর পানি ছিল ভরসা, এখন সেখানে নির্ভর করতে হচ্ছে গভীর নলকূপ ও ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় অনেক নলকূপেও পর্যাপ্ত পানি মিলছে না। এতে সেচ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে কয়েক গুণ।
স্থানীয় কৃষক আবুল মতিন বলেন, ‘আগে নদীতে সারা বছর পানি থাকত। এখন শুকনো মৌসুমে নদীর চিহ্নও পাওয়া যায় না। পানি না থাকলে সেচ দেব কীভাবে?’
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়াই এই সংকটের মূল কারণ। নদী খনন, দখলমুক্ত করা এবং বড় নদীর সঙ্গে পুনঃসংযোগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। বিশেষ করে পদ্মা নদীর সঙ্গে সংযোগ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
বানেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক দুলাল বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে জানানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নদী খনন ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজশাহী নগরীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা নদীর তীরও এখন দখলের শিকার। লালন শাহ মুক্তমঞ্চ এলাকার সামনে গড়ে উঠেছে শতাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকানপাট। জেলার বিভিন্ন এলাকায় একইভাবে নদীর জমি দখল করে চলছে ব্যবসা-বাণিজ্য।
এ ছাড়া বড়াল, নারদ ও হুজা নদীতে বাঁধ দিয়ে স্থানীয়ভাবে ধান ও মাছ চাষ করা হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। নগরীর বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনামিশ্রিত পানি বারনই নদীর মাধ্যমে পবা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করায় কৃষিজমির উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক দখলদার কোনো ধরনের লিজ ছাড়াই সরকারি জমিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। কেউ কেউ আবার সরকারি জমিকে নিজেদের দাবি করে চাঁদা উত্তোলনও করছেন।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেছেন, ‘শুধু রাজশাহী মহানগরীতেই ১ হাজার ৬১২ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা করা হয়েছে। তাদের নোটিশ দিয়ে পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।’ তিনি জানান, বিষয়টি জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামকে অবহিত করা হয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।
নওগাঁ জেলার আত্রাই, ছোট যমুনা, তুলশীগঙ্গা, শিবনদ ও নাগর নদীসহ অন্তত ছয়টি নদী ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। একসময়ের খরস্রোতা নদীগুলো বর্ষা মৌসুমেও অনেক স্থানে মরা খালের মতো পড়ে থাকে। নদীর দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠছে ভবন ও শিল্প-কারখানা। দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় পলি জমে নাব্য কমে গেছে। একই সঙ্গে নদীগুলো পরিণত হয়েছে ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থানে। এতে নদীর পানি দূষিত হয়ে আশপাশের কৃষিজমি ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে নাটোর জেলার ১৯টি নদীর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নারদ ও বড়াল নদীর। এ ছাড়া বারনই ও মুসা নদীও দখলের শিকার হচ্ছে। জেলার ৫৮টি বড় খালের অধিকাংশই এখন অবৈধ দখলে।
নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সরকারদলীয় হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, ‘সরকার নদী সংস্কার ও খাল খননের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও খাল পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার চারটি প্রধান নদীর মধ্যে মহানন্দাতে রাবার ড্যাম ও পাগলা নদী খননের কারণে কিছুটা নাব্য থাকলেও পুনর্ভবা ও পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। জেলার বেশির ভাগ খালই এখন দখল ও দূষণের কবলে।
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী মৃতপ্রায় নদী ও খাল দখলমুক্ত করে সংস্কার ও খননের কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভাগের আট জেলাতেই এসব কার্যক্রম চলবে।’