সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পাশের এলাকার নাম ‘বাইশটিলা’। সেখানে গুনে গুনে ২২টি টিলার অবস্থান এখন আর নেই। তবে নাম আছে। আর আছে প্রাকৃতিকভাবে বিচ্ছিন্ন টিলা।
সেসব থেকে একটি টিলাকে ‘নিঃসঙ্গ টিলা’ নাম দিয়ে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে দিনব্যাপী অবসরযাপনকেন্দ্র গড়া হচ্ছিল। সিলেট জেলা পরিষদের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটি ঘিরে পুরো এলাকাজুড়ে পর্যটন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেই নিঃসঙ্গ টিলা পাবে পর্যটক-সঙ্গ।
শুক্রবার (৮ মে) বিকেলে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ওই এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় সিলেট জেলা পরিষদ প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী, সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাবেক সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোশনূর রুবাইয়াৎ, সিলেট সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাশেম উপস্থিত ছিলেন। জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার সিংহ ও টিলাবান্ধব প্রকল্পের স্থপতি রাজন দাশ মন্ত্রীকে প্রকল্পের সম্ভাব্য দিক সম্পর্কে অবহিত করেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন সাধারণত টিলা কর্তন করে হয়। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম সিলেট জেলা পরিষদের একটি প্রকল্প। ‘ন্যাচারাল পার্ক’ এলাকার একটি টিলাকে অক্ষত রেখে স্থাপন করা হচ্ছে টিলাবান্ধব প্রকল্প। প্রায় ৮০ ভাগ প্রকল্পকাজ সম্পন্নের পর স্থানটি পরিদর্শন করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। প্রকল্প এলাকা ঘুরে তিনি জানিয়েছেন, এই প্রকল্প এলাকা ঘিরে হবে ‘পর্যটন হাব’।
জেলা পরিষদের টিলাবান্ধব প্রকল্পটি নিয়ে গত বছরের ২৮ এপ্রিল খবরের কাগজে ‘শত বছর পর টিলাবান্ধব প্রকল্প’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল। প্রতিবেদনটিতে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে প্রকাশ হয়েছিল এ রকম প্রকল্প প্রায় শত বছর পর নেওয়া হয়েছে।
ইতিহাস ঘেঁটে বলা হয়েছিল, এমসি (মুরারিচাঁদ) কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৮৯২ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠার প্রায় ৩০ বছর পর ১৯২১ সালে কলেজটি সিলেট শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে টিলাগড় এলাকার ‘থ্যাকারে টিলা’ নামক স্থানে স্থানান্তর হয়। স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, ১৭ শতকের শেষভাগে যখন ব্রিটিশ সরকার সিলেট প্রশাসনিক কার্যক্রম তথা কালেক্টরেট সাজায়, তখন টিলাভূমি বেছে নেওয়া হয়েছিল। সিলেটের প্রথম কালেক্টরেট (ডিসি) উইলিয়াম ম্যাইকপিস থ্যাকার তার দাপ্তরিক ভবন নির্মাণ করেছিলেন টিলার চূড়ায়। বর্তমানে এমসি কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত সেই টিলাটি অবিকল থাকায় নাম হয়েছে ‘থ্যাকারের টিলা’।
এমসি কলেজ ক্যাম্পাসের ১২৪ একর জায়গার পুরোটা টিলাভূমি। প্রথম অবকাঠোমো নির্মাণ হয় ১৯২১ সালে। নির্মাণরীতিতে সেমিপাকা আসাম প্যাটার্নের স্থাপনা স্থাপন করার মূলে ছিল টিলা রক্ষা করা। মূল ভবন নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন আসামের তৎকালীন গভর্নর স্যার উইলিয়াম মরিস। নির্মাণ শেষে ১৯২৫ সালে উদ্বোধন করেছিলেন আসামের আরেক গভর্নর স্যার উইলিয়াম রীড। শত বছর আগে সরকারিভাবে টিলাবান্ধব সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও পরবর্তী সময়ে তা আর অনুসরণ হয়নি।
বাইশটিলার অবস্থান এমএজি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লাগোয়া। নিরিবিলি পরিবেশ ও প্রকৃতি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। সবুজ-পাহাড়-টিলা আর হাওর-বিলের জলরাশি সেখানকার প্রাকৃতিক আকর্ষণ। বাইশটিলার লালবাগ দক্ষিণপাড়ায় সিলেট জেলা পরিষদের নিজস্ব জায়গা ‘ন্যাচারাল পার্ক’ প্রস্তাবিত এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জেলা পরিষদের মোট ৫৬ একর জায়গার একটি অংশ বিমানবন্দরের রানওয়ের সংরক্ষিত সীমানাপ্রাচীর সম্প্রসারণে ছেড়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে পাঁচটি টিলা ও একটি জলাশয় মিলিয়ে মোট ৪০ একর জায়গা রয়েছে। ন্যাচারাল পার্ক প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে সেখানকার প্রকৃতিকে অক্ষত রাখতে। প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রায় ৮০ ভাগ কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর বাণিজ্যমন্ত্রী স্থানটি পরিদর্শন করেন।
টিলাবান্ধব প্রকল্পের নকশা করেছেন স্থপতি রাজন দাশ। প্রকৃতিকে নষ্ট না করার প্রথম ধাপের কাজ সম্পন্নে স্থপতির কথা শুনেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মুক্তাদির। এরপর পুরো এলাকাকে পর্যটন-হাব করার কথা জানান।
স্থপতি রাজন খবরের কাগজকে বলেন, এখানকার টিলাগুলোর মধ্যে একটি টিলা আইসোলেটেড (বিচ্ছিন্ন)। স্থপতির চোখে এটি ‘নিঃসঙ্গ টিলা’ হিসেবে চিহ্নিত । টিলার চূড়ায় স্থাপনা স্থাপন করা হবে। সেকালে থ্যাকারের টিলা থেকে এ কালের বাইশটিলার ‘নিঃসঙ্গ টিলা’ নিয়ে স্থপতির ভাষ্য, ‘প্রকৃতির লীলাখেলা প্রাকৃতিকভাবে দেখতে আমরা নিঃসঙ্গ টিলার নিঃসঙ্গতা চিরতরে ঘোচাতে চাই।
প্রথম ধাপের কাজ শেষে টিলার ঢালে ঋতুভিত্তিক গাছগাছালি রোপণ করা হবে। আলাদা করে চিহ্নিত করা থাকবে বর্ষার গাছ, বসন্তের গাছ। এর মধ্যে এমনও ভাবনার বাস্তবায়ন চিন্তা রয়েছে যে, বছরের ছয়টি ঋতুতে প্রকৃতির ছয় রকম সাজে সজ্জিত হবে এলাকা। যাতে একেক ঋতুতে প্রকৃতির একেক সাজ দেখা যায়। এসবের নকশা মন্ত্রীকে দেখানো হয়েছে।’
জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, প্রকল্পটির নাম ‘দিনব্যাপী প্রাকৃতিক অবকাশ যাপন কেন্দ্র’। বাইশটিলার অনেক টিলার মধ্যে নিঃসঙ্গটিলা ও তার তিন পাশজুড়ে থাকা প্রাকৃতিক জলাশয়কে কেন্দ্র করে জেলা পরিষদ কর্তৃক গৃহীত ‘বাইশ টিলা ন্যাচারাল পার্ক’ প্রকল্পের প্রথম ধাপের অংশ। এতে জলাশয়ের একপাড় সরকারি রাস্তার পাশে একটি ঘাট থাকবে (ভিজিটরস রিসেপশন পয়েন্ট) যেখান থেকে টিকিটিং ও সিকিউরিটি চেক-আপের পর স্পিডবোট/দেশীয় নৌকা করে বিপরীত পাড়ের ঘাটে (ল্যান্ডিং ডেকে) নামতে হবে এবং সেখান থেকে টিলার গা-বেয়ে ওঠা সিঁড়ি দিয়ে ক্রমশ ওপরে উঠলেই ছাউনি পাওয়া যাবে। সেখান থেকে আরেকটু এগোলেই টিলার খাঁজে খাঁজে বিভিন্ন উচ্চতায় তৈরি করা দোচালা চৌচালা বসার ব্যবস্থা।
গাছগুলো আগের মতোই আছে। তবে আকাশমণি গাছের প্রাধান্য বেশি। প্রকল্পে তাই দেশি ও সিলেটের স্থানীয় বৃক্ষ-গুল্মকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই চাউনিগুলোতে বসলে চারদিকের বৃক্ষরাজি ও জলাশয়ের মেলবন্ধনে রচিত দৃশ্য ব্যক্তিমাত্রকেই বিমোহিত করবে। এখানে রাত্রিযাপনের কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। মিষ্টি সকাল, স্তব্ধ দুপুর আর নরম রঙিন বিকেল কাটানোর এক একান্ত পরিসর হবে এটি। একটি কিচেন ও রেস্টরুম থাকবে, যাতে ব্যবহারকারীরা হালকা খাবার খাওয়ার সুযোগ পান। ঝিলের মাঝখানে একটি মাটির ঢিবি আছে যেখানে একটি দড়ি দিয়ে তৈরি ঝুলন্ত সেতু থাকবে উপভোগের অংশ হিসেবে। এ ছাড়া বড়শি দিয়ে মাছ ধরার ব্যবস্থাও রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয়নি। সেই সব বিষয়গুলো নিয়েই বাণিজ্যমন্ত্রীর সরজেমিন পরিদর্শন শেষে তার পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছে। বাইশটির বড় টিলার চতুর্দিকে ক্যাবল-কার লাইন, শিশুদের জন্য বিভিন্ন রাইড ও খেলার ব্যবস্থা, ফুডকোর্ট, অ্যাম্পিথিয়েটার, মেলার স্থান, রিসোর্ট, পার্কিং ও রেস্টরুমের ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখেই পরবর্তী মাস্টারপ্ল্যান করা হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী বাইশটিলাকে একটি পর্যটকবান্ধব স্থানে পরিণত করার আশা ব্যক্ত করেন।