স্বপ্ন ছিল বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন, বছরের পর বছর বয়ে বেড়ানো ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি দেবেন বৃদ্ধ মা-বাবাকে। কিন্তু সেই স্বপ্ন মাঝপথেই থমকে গেল এক পৈশাচিক ড্রোন হামলায়। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন সাতক্ষীরার দুই যুবক শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম। এই দুই রেমিট্যান্স যোদ্ধার অকাল মৃত্যুতে সাতক্ষীরা সদর ও আশাশুনি উপজেলার দুটি গ্রামে এখন চলছে শোকের মাতম। স্বজন হারানোর বেদনার পাশাপাশি ঋণের পাহাড় এখন পরিবার দুটির সামনে এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের আফসার আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম। চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা শফিকুল একসময় সরকারি আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘরে থাকতেন। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছায় স্থানীয়ভাবে কিছু ঋণ নিয়ে একটি ঘর তোলেন। কিন্তু সেই ঘরের ঋণ এবং সংসারের অভাব মেটাতে তিনি পাড়ি জমান লেবাননে। মাস তিনেক আগে যখন তিনি দেশ ছাড়েন, তখন তার কাঁধে ছিল তিনটি এনজিও থেকে নেওয়া প্রায় ৫-৬ লাখ টাকার ঋণের বোঝা।
আরও পড়ুন- লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ২ প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত
লেবাননে যাওয়ার পর থেকেই দিনরাত পরিশ্রম শুরু করেন শফিকুল। উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত টাকা পাঠিয়ে দেনামুক্ত হওয়া। গত মাসে তিনি প্রথম কিস্তিতে ৪০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। বাড়িতে থাকা স্ত্রী রুমা খাতুন ও দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু সোমবার (১১ মে) বাংলাদেশ সময় দুপুরে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা সব ওলটপালট করে দেয়। হামলায় ঘটনাস্থলেই শফিকুল নিহত হন।
শফিকুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্ত্রী রুমা খাতুন বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। দুই শিশুকন্যা বুঝতেই পারছে না, তাদের বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না।
বৃদ্ধ মা আজেয়া খাতুন বিলাপ করে বলেন, ‘আমার ছেলেটা তো কারও ক্ষতি করেনি, তবে কেন তাকে এভাবে মরতে হলো? এখন এই এতিম বাচ্চাগুলো আর ঋণের টাকা নিয়ে আমরা কোথায় যাব?’
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন দিশেহারা পুরো পরিবার।
নাহিদুলের আত্মত্যাগ ও শোকাতুর পরিবার
একই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটেছে আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামে। ওই গ্রামের আব্দুল কাদের ও নুরুন্নাহার খাতুন দম্পতির ছেলে নাহিদুল ইসলাম। নোনা পানির এই জনপদে দারিদ্র্য ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে এই পরিবারটি দীর্ঘ সময় এলাকাছাড়া ছিল। ঢাকায় সপরিবারে শ্রমিকের কাজ করে কোনোমতে দিন কাটত তাদের। বাবার মাথার ওপর থাকা সুদের ঋণের বোঝা কমাতে নাহিদুল নিজের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে এবং চড়া সুদে টাকা ধার নিয়ে লেবাননে পাড়ি জমান।
নাহিদুলও লেবাননের সেই একই ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান। প্রবাসে যাওয়ার পর মাত্র এক মাস আগে তিনি ৩৭ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন বাড়িতে। পরিবারের আশা ছিল, নাহিদুলের পাঠানো টাকায় এবার হয়তো ঘরে ঈদের আনন্দ ফিরবে, মুক্তি মিলবে পাওনাদারদের হাত থেকে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই নাহিদুল এখন কফিনে ফেরার অপেক্ষায়।
নাহিদুলের বাবা আব্দুল কাদের কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘ছেলে বলেছিল, বাবা তুমি চিন্তা করো না, আমি সব ঋণ শোধ করে তোমাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রামে ফিরিয়ে আনব। আজ আমার ছেলে নেই, আমি এখন এই ঋণের বোঝা নিয়ে কী করব?’
মা নুরুন্নাহার খাতুন ছেলের শোকে শয্যাশায়ী। পুরো কাদাকাটি গ্রামজুড়ে এখন শোকের ছায়া। পাড়া-প্রতিবেশীরা এসে কেবল সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কিন্তু এই অপূরণীয় ক্ষতি পূরণের কোনো ভাষা কারও জানা নেই।
দুই পরিবারের এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আশাশুনির কাদাকাটি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বাবু হোসেন জানান, নিহত দুই যুবকই ছিলেন তাদের পরিবারের একমাত্র আশার আলো। তাদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো শুধু স্বজন হারায়নি, বরং ঋণের এক অতল গহ্বরে পড়ে গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকার যেন অবিলম্বে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে নিহত শফিকুল ও নাহিদুলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে এই নিঃস্ব পরিবার দুটির জন্য বিশেষ আর্থিক অনুদান ও ঋণের বোঝা লাঘবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
জাকির/রিফাত/