বরগুনার আমতলী ও তালতলী উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের প্রায় ৩৬ কোটি টাকার কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তিন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেন বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সাবেক এপিএস ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন। তিনি তালতলী উপজেলার বাসিন্দা।
বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী। আগামীকাল ১৪ মে থেকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
অভিযুক্তরা হলেন বরগুনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল চন্দ্র গাইন ও সহকারী প্রকৌশলী রাজিব শাহ।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ তদন্তে বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ মো. নুরুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বরগুনা এলজিইডির রেস্ট হাউসে অবস্থান করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২৩ জুন বরগুনায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের পর থেকেই মো. মেহেদী হাসান বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন দাবি করেন, জলবায়ু প্রকল্পের আওতায় খাল খননের কাজেও অনিয়ম হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো প্রকল্পের অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চলতি বছরের মার্চ মাসে আমতলী-তালতলী উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩৬ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে ৭৭টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। গত ২০ এপ্রিল অনিয়ম ও অনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। এসব কাজে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান। তাকে সহায়তা করেন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল চন্দ্র গাইন ও সহকারী প্রকৌশলী রাজিব শাহ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কাজ পাওয়া ৪টি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কেউ আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ, আবার কেউ অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের আত্মীয়স্বজন। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বরিশালের এমএস লুৎফুর কবির ট্রেডার্স, গোপালগঞ্জের এমএস নুর কনস্ট্রাকশন, নড়াইলের এসএম লেলিন ট্রেডার্স (জয়েন্ট ভেঞ্চার) ও ঝিনাইদহের নিশিত বসু ট্রেডার্স।
অভিযোগ রয়েছে, আমতলী-তালতলীর বিভিন্ন মসজিদ ও মন্দির সংস্কার প্রকল্পেও ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়া হয়েছে। পরে নিম্ন মানের কাজ করিয়েই বিল ছাড় দেওয়া হয়।
গুলিশাখালী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বলেন, একটি মসজিদ সংস্কারের জন্য তিন লাখ টাকা বরাদ্দ এলেও ঠিকাদার মাত্র দেড় লাখ টাকা দিয়েছেন। বিষয়টি নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানানো হলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।
খুরিয়ার খেয়াঘাট সবুর গাজী চৌকিদার বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ঠিকাদার মাত্র এক লাখ টাকার কাজ করেছেন। অভিযোগ করার পর কাজ যা হয়েছে, তা মেনে নিতে বলা হয়েছিল।
কড়াইবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. রেদওয়ান সরদার বলেন, সড়কে ঢালাইয়ের কিছুদিন পরই কার্পেটিং উঠে যায়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
অভিযোগকারী ওমর আব্দুল্লাহ শাহীন বলেন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ নিজেদের ঘনিষ্ঠ ও আত্মীয়স্বজনদের পাইয়ে দিতে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়া হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান। তিনি বলেন, কেন অভিযোগ দেওয়া হয়েছে তা অভিযোগকারীই বলতে পারবেন। টেন্ডার-প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়নি।
তদন্ত কর্মকর্তা ও এলজিইডির বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ মো. নুরুল ইসলাম বলেন, তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্টদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল ১৪ মে থেকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হবে।