হাওরের বুকজুড়ে এখন শুধু পানি আর পচে যাওয়া ফসলের স্তূপ। টানা বৃষ্টি ও ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, এক মাস পার হলেও কৃষকের সেই দুর্দশার শেষ হয়নি।
বুকসমান পানি ও পচে যাওয়া ধানের খেতে দাঁড়িয়ে তারা এখন শুধু তাকিয়ে দেখছেন বছরের একমাত্র ফসল কীভাবে নষ্ট হচ্ছে। কোথাও পানি থেকে কেটে আনা ধান রোদে শুকাতে না পেরে চারা গজিয়ে গেছে, কোথাও আবার পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে।
তবু কৃষক থেমে নেই, পচা ধান-খড় শুকিয়ে নিজেদের ও গবাদিপশুর খাবার উপযোগী করতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন তারা। সামনে ঈদ থাকলেও কৃষক পরিবারে কোনো আনন্দ নেই। সব আনন্দ যেন পানিতে তলিয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জের দেখার হাওরপাড়ের রাবার বাড়ি এলাকার কৃষক আবু বকর এবার ১০ কেয়ার (৩০ শতক) জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র দুই কেয়ার জমির ধান কেটে আনতে পেরেছেন। বাকি সব ধান এখনো জমিতে পানির নিচে তলিয়ে আছে।
হাওরে মধ্য দুপুরে প্রায়ই তাকে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করতে দেখা যায়। কখনো আবার রোদের মধ্যে বসে নিজের ধানের জমির দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। যে ধান কেটে এনেছেন, সেটিও রোদ না পাওয়ায় নষ্ট হয়ে গেছে। এখন পরিবারের গরুর খাবারের জন্য অন্যের ফেলে দেওয়া খড় সংগ্রহ করেই দিন কাটছে তার।
আবু বকর বলেন, ‘মরার মতো অবস্থা। কোনো কিছু বাকি নেই। জমিতে ধান পড়ে আছে। গলা সমান পানি। অসহায় হয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করার নেই।’ একই গ্রামের কৃষক আব্দুল জাহান বলেন, ‘এবার সব শেষ। কিছুই করার নেই। ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার টাকাটাও দিতে পারব না। ঈদও করতে পারব না।’
সরেজমিনে গিয়ে আরও দেখা যায়, রোদ ওঠায় হাওর এলাকায় কেউ পচা ধান শুকাচ্ছেন। কেউ পচা খড় সংগ্রহ করছেন গরুকে খাওয়ানোর জন্য, কেউ আবার পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে ধান কেটে আনার চেষ্টা করছেন। শ্রমিক সংকটে অনেক কৃষক নিজের সন্তানদের নিয়েই মাঠে নেমেছেন।
সুনামগঞ্জের একটি বা দুটি হাওরে নয়, পুরো জেলাজুড়েই এই অবস্থা। পচা দুর্গন্ধ আর কৃষক পরিবারের নীরব কান্না মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সামনে ঈদ থাকলেও কৃষকের জীবনে এখন কোনো প্রস্তুতি নেই। পানির নিচে তলিয়ে গেছে ঈদের খুশিও।
সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য খলিল রহমান বলেন, ‘হাওর এলাকার কৃষক এবার যে দুর্ভোগে পড়েছেন এই দুর্ভোগ আগামী কয়েক বছর টানতে হবে। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সরকারি সহায়তা দিতে হবে, না হলে কৃষকরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক বলেন, রোদের অভাবে কেটে আনা ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, গত এক মাসে সুনামগঞ্জের হাওরে বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সঠিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হচ্ছে। জনপ্রতিনিধি ও ইউএনওদের নিয়ে কমিটি করা হয়েছে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তালিকা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সংসদ সদস্যদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। ঈদকে সামনে রেখে তাদের সহায়তা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলার ছোট বড় হাওরে এবার প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর বোরো ফসলের আবাদ করা হয়েছিল। গত এক মাসে অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বেশির ভাগ হাওরের ফসল পানির নিচে তলিয়ে যায়। সরকারি হিসেবে ৫শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে স্থানীয়দের ধারণা, প্রকৃত ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।