দিনের ব্যস্ততা শেষে যখন গ্রামের মানুষ ঘুমিয়ে পড়েন, তখন পঞ্চগড়ের সীমান্তবর্তী অনেক গ্রামের মানুষের শুরু হয় অন্য এক দায়িত্ব। হাতে টর্চ লাইট, লাঠি আর বাঁশি নিয়ে তারা রাতভর পাহারা দেন নিজ এলাকার সীমান্ত। উদ্দেশ্য একটাই, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পুশইন প্রতিরোধ।
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় পুশইনের অভিযোগ ও অনুপ্রবেশের আশঙ্কা বাড়ার পর মানুষের মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে। ফলে বিভিন্ন সীমান্তের গ্রামের বাসিন্দারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাতভর টহল দিচ্ছেন। কেউ গাছতলায় অবস্থান করছেন, কেউ বাজারের দোকানের সামনে, আবার কেউ চা বাগানের ভেতরে কিংবা সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে নজরদারি চালাচ্ছেন।
বুধবার রাতে জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের ফকিরপাড়া ও একই উপজেলার তিরনইহাট ইউনিয়নের ইসলামবাগ এলাকার সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় যুবকসহ নানা বয়সী মানুষ সীমান্তে পাহারা দিচ্ছেন। তারা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে রাতভর পাহারার দায়িত্ব পালন করছেন। বিপদের আভাস পেলেই বাঁশি বাজিয়ে অন্যদের সতর্ক করছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সীমান্তে কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তিকে দেখলেই তারা সঙ্গে সঙ্গে বিজিবিকে খবর দেয়। এতে সীমান্তে নজরদারি আরও কার্যকর হচ্ছে।
গত কয়েক দিন ধরে বিজিবি সদস্যরা সীমান্তবর্তী বিভিন্ন গ্রামে প্রচার-প্রচারণা, সচেতনতামূলক মাইকিং ও উঠান বৈঠক করছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে যৌথভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর ফলে সীমান্ত এলাকায় মানুষের অংশগ্রহণও বেড়েছে।
এরই মধ্যে জেলার সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্তে ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টায় ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা জন্ম দেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে ওই ব্যক্তিদের দেখতে পান এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে অবহিত করেন। পরে বিজিবি ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে সেখানে অবস্থান নেয়। স্থানীয় মানুষ ও বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেনি এবং ভারতীয় সীমান্ত এলাকাতেই অবস্থান করতে বাধ্য হন।
জানা গেছে, পঞ্চগড় জেলার মোট সীমান্ত এলাকার দৈর্ঘ্য ২৭৭ দশমিক ৯১৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে পঞ্চগড় ব্যাটালিয়ন (১৮ বিজিবি) দায়িত্ব পালন করছে ১৩৫ দশমিক ৫৯১ কিলোমিটার, ঠাকুরগাঁও ব্যাটালিয়ন (৫০ বিজিবি) ১৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার এবং নীলফামারী ব্যাটালিয়ন (৫৬ বিজিবি) ১২৮ দশমিক ৯২৪ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে।ং
তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের ফকিরপাড়া এলাকার যুবক খাইরুল ইসলাম বলেন, আমরা সীমান্ত এলাকার মানুষরা হোসেনের ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছি। আমরা কোনোভাবেই পুশইন নেবো না। তাই আমরা বিজিবির সঙ্গে সীমান্তে পাহারা দেই। যারা দিনে সময় পায় দিনে, আর যারা রাতের সময় পাই রাতে সীমান্তে পাহারা দেই।
বারেকুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, আমরা সীমান্তের মানুষ শান্তিপ্রিয়। আমরা কোনোভাবেই ভারতীয় মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেবো না। তাই আমরা কষ্ট হলেও দেশের স্বার্থে সীমান্তে টহল দেই।
ইসলামবাগ এলাকার যুবক রাহাত আলী বলেন, আমরা দিনে কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পর রাতের খাবার খেয়ে সীমান্ত পাহারা দিতে বের হই। আমাদের সবার কাছে লাঠি, টর্চলাইট ও বাঁশি থাকে। বাঁশি বাজলেই আমরা বুঝে নিই কোথাও সমস্যা হয়েছে। পরে সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিজিবি ও স্থানীয়রা সেখানে উপস্থিত হই এবং বিষয়টি তদন্ত করি।
এদিকে তেঁতুলিয়ার বোয়ালমারী এলাকার সাব্বির হোসেন বলেন, আমার পকেটে সব সময় একটি বাঁশি থাকে। বাশিটি আমাকে বিজিবি দিয়ে গেছে। সীমান্তে কোনো ঘটনা ঘটলে বাঁশি বাজার শব্দ শোনা মাত্রই বিজিবি ছুটে আসেন। গত কয়েকদিন থেকে আমরা এভাবে সীমান্তে পাহারা দিচ্ছি।
ভজনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য তবিবর রহমান বলেন, বিজিবির উদ্যোগে স্থানীয় মানুষ অনেক সচেতন হয়েছেন। সবাই মিলে কাজ করায় সীমান্তে নজরদারি আরও শক্তিশালী হয়েছে। আমরা সবাই রাত জেগে আমাদের সীমান্ত পাহারা দিচ্ছি।
পঞ্চগড়-১৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ কায়েস বলেন, সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও পুশইন ঠেকাতে আমরা সব সময় তৎপর রয়েছি। আমরা অবস্থানের পাশাপাশি টহল জোরদার করেছি। এ বিষয়ে স্থানীয় মানুষদের সচেতন করছি। স্থানীয়রাও আমাদের অনেক সহযোগিতা করছেন। গ্রামবাসীরা রাত জেগে আমাদের সঙ্গে পাহারা দিচ্ছেন।
রনি/নাঈম