পাবনার ঈশ্বরদীতে মাদকের বিস্তার এখন শহর থেকে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। মাদক ব্যবসায়ীরা আগের চেয়ে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মদ, গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইনের পর নতুন নতুন মাদক ঢুকছে এলাকায়। জীবন ধ্বংসকারী এসব নেশাদ্রব্য পাচারে চক্রটি রুট হিসেবে সড়ক, রেল ও নৌপথকে ব্যবহার করছে।
পাশাপাশি অস্ত্র কেনাবেচার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে তারা। এসবের জেরে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ বাড়ছে। এ অবস্থায় চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন এলাকাবাসী। স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চললেও মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক সময় ঈশ্বরদীতে মাদক বলতে ফেনসিডিল, মদ ও গাঁজা সেবনের কথা শোনা যেত। এখন ইয়াবা, হেরোইন, ট্যাপেনডল ট্যাবলেটের ব্যবহারও বেড়েছে। এসব নেশাদ্রব্য শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত অবাধে বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-যুবকদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা বেশি।
পুলিশসূত্র বলছে, মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ঈশ্বরদীকে। নদী, সড়ক ও রেলপথে প্রতিনিয়ত মাদক প্রবেশ করছে উপজেলায়। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণই এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, অন্যান্য জেলার সঙ্গে নির্বিঘ্নে সড়ক, নৌ ও রেল যোগাযোগ থাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা সহজেই ঈশ্বরদীতে মাদক আনতে পারছে। মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে দু-একজনকে আটক করা হলেও অধিকাংশ মাদক ব্যবসায়ী ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। শহরের ফতেমোহাম্মদপুর, বস্তিপাড়া, মিলপট্টি, কাচারিপাড়া, আড়ামবাড়িয়া ও পাকশীর হঠাৎপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনা-বেচা হচ্ছে প্রকাশ্যে। এসব স্থান থেকে মাদক পৌঁছে যাচ্ছে আসক্তদের হাতে।
চলতি মে মাসে কয়েকজন মাদকসহ ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার এবং অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের ঘটনায় ঈশ্বরদী নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেকে অন্য পেশার আড়ালে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায় জড়িত রয়েছে। তাদের শনাক্তে গোয়েন্দা পুলিশ তৎপর বলে জানানো হয়েছে।
উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়ন ঘুরে জানা যায়, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় একটি অসাধু চক্র দীর্ঘদিন ধরে দিনের পাশাপাশি রাতেও মাদক কেনাবেচা চালিয়ে যাচ্ছে। সাহাপুর মসজিদ মোড়, মন্ত্রী মোড়, আজিজল তলা, নিশীতলা, সাবেক চেয়ারম্যান মিনাজ ফকিরের বাড়ির সামনে, সিলিমপুর বাজার, দীঘা, তিলকপুর, রহিমপুর, তিলকপুর সরদার মার্কেট, আওতাপাড়া গার্লস স্কুলের পেছন, আওতাপাড়া বাজার, বাঁশের বাধা দোকান ও স্কুলপাড়া এলাকায় মাদক বিক্রির হটস্পট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলার অন্য ছয় ইউনিয়নের চিত্রও একই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঈশ্বরদী বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, মাদকাসক্ত যুবকরা নেশার টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। প্রায়ই বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনা ঘটছে। তারা মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর ভূমিকা দাবি করেন।
কলেজশিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক হাসানুজ্জামান বলেন, ‘আগের তুলনায় এখন মাদকের বিস্তার অনেক বেশি। তরুণ-যুবকরাই মাদক সেবন ও ব্যবসার সঙ্গে বেশি জড়িত। তারা স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের হাতেও মাদক তুলে দিচ্ছে। সন্তানদের মাদকাসক্তি নিয়ে অধিকাংশ পরিবারেই অশান্তি বিরাজ করছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এদের নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কৌশলী ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সদস্য জানান, মাদক কারবারিরা মোটরসাইকেল, সিএনজি কিংবা ব্যক্তিগতভাবে পকেটে করে মাদক বহন করছে। অনেক সময় অন্য এলাকার লোকজনকে দিয়ে মাদক পরিবহন করানো হয়, যাতে তারা পুলিশের সন্দেহের বাইরে থাকে। এভাবে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মাদক এক স্থান থেকে আরেক স্থানে সরানো হচ্ছে।
ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুর রহমান বলেন, ‘নদী, সড়ক ও রেলপথে ঈশ্বরদীতে মাদক প্রবেশ করছে। পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এখানে মাদকের প্রবণতা বেশি। মাদকের বিরুদ্ধে আগেও আমরা সোচ্চার ছিলাম, এখনো আছি। প্রতিদিন বিভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে কাজ করলেও মাদক নিয়ন্ত্রণই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর একযোগে কাজ করছে।’