ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌরশহরের সড়কবাজারের পুরোনো সিনেমা হলের সামনে বসে আছেন মিন্টু দাস। দুপুরের রোদ একটু নরম হয়ে এলেও তার হাত থেমে নেই। পায়ের চাপে ঘুরছে পুরোনো শাণের চাকা। সেই ঘূর্ণনের সঙ্গে মিলেমিশে উঠছে ধাতুর কড়মড় শব্দ। পাথরের গায়ে ছুরি ছুঁইয়ে দিচ্ছেন, আর আগুনের ক্ষুদ্র ফুলকির মতো ছিটকে পড়ছে আলো। যেন সময়ের বুকেই শান দিচ্ছেন তিনি।
একসময় এই দৃশ্য ছিল বাংলার চেনা জীবনচিত্র। পাড়া-মহল্লায় শোনা যেত পরিচিত হাঁক- ‘শাণওয়ালা আইছে… দা-ছুরি শান দেন…’। সেই ডাক শুনে ঘরের পুরোনো দা, বটি, ছুরি হাতে ছুটে আসতেন গৃহস্থরা। এখন আর সে ডাক শোনা যায় না বললেই চলে। আধুনিক যন্ত্রপাতির শব্দে হারিয়ে যাচ্ছে শাণওয়ালাদের চাকার ঘূর্ণন।
হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার বাসিন্দা মিন্টু দাস। বাবার নাম সুনীল দাস। বংশপরম্পরায় তারা এই পেশার সঙ্গে জড়িত। ছোটবেলায় বাবার পাশে বসেই হাতে উঠেছিল শাণের কাজ। সেই হাতেখড়ি থেকে প্রায় এক যুগ পেরিয়ে গেছে। এখন তার নিজেরও পরিবার হয়েছে। কিন্তু জীবনের ধার এখনো ভোঁতা হয়ে আছে।
কাজের ফাঁকে কথা বলতে বলতে মিন্টু দাসের চোখে জমে ওঠে আক্ষেপের ছায়া। তিনি বলেন, ‘‘একটা সময় কোথাও গেলে সবাই বলতো, ‘শাণওয়ালা এসেছে’ তখন মানুষ পুরোনো দা-ছুরি নিয়ে দৌড়ে আসতেন। এখন আর সেই দিন নেই। আধুনিক মেশিনের কাছে আমাদের পৈতৃক পেশা হারিয়ে যেতে বসেছে।”
তিনি জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে কিছুটা কাজ বাড়ে। কোরবানির আগে মানুষ দা-ছুরি শান দিতে আসে। তবে বছরের বাকি সময়টা কাটে অনিশ্চয়তায়। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে এই পেশার অনেকেই ইতোমধ্যে অন্য কাজে চলে গেছেন।
সড়কবাজারের ব্যবসায়ী নুরে আলম বলেন, ‘একসময় পাড়া-মহল্লায় প্রায়ই শাণওয়ালাদের দেখা যেত। চাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তারা দা-ছুরিতে শান দিত। এখন তেমন চোখেই পড়ে না। আধুনিক যন্ত্র আর প্রযুক্তির কাছে তারা হারিয়ে যাচ্ছে।’
শুধু একটি পেশাই নয়, হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার এক টুকরো লোকজ ঐতিহ্যও। যে চাকার ঘূর্ণনে একসময় সংসারের প্রয়োজন মিটতো, আজ সেই চাকা ঘুরছে টিকে থাকার লড়াইয়ে। মিন্টু দাসেরা এখনো পথের ধারে বসে থাকেন-হয়তো কোনো পুরোনো দা হাতে কেউ এসে দাঁড়াবে, আর সেই সঙ্গে ফিরে আসবে অতীতের চেনা ডাক।
কিন্তু সময় কি আর পেছনে ফিরে তাকায়? শহরের ব্যস্ততায় মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত, আর শাণওয়ালাদের চাকা ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে ইতিহাসের প্রান্তে।
অমিয়/