পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কুমিল্লায় জমে উঠেছে কোরবানির পশুর বাজার। জেলার ১৭ উপজেলায় এবার চাহিদার চেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত হয়েছে। কোরবানির পশু কেনাবেচা, হাট ইজারা, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসা মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার লেনদেনের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসসূত্রে জানা গেছে, এবার কুমিল্লায় খামারি ও প্রান্তিক পর্যায়ে লালন-পালন করা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার গবাদিপশু। জেলার চাহিদা রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার পশু। সে হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকবে প্রায় ১২ হাজার পশু। এসব পশু দেশের অন্য জেলাতেও সরবরাহ করা যাবে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামছুল আলম বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি কুমিল্লায় শুধু কোরবানির পশু বেচাকেনাই প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে। এ ছাড়া হাট ইজারা, পরিবহন, রশি, বাঁশের খুঁটি, মসলা বিক্রি ও পশু জবাইকে কেন্দ্র করেও বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসবে।’
তিনি বলেন, ‘জেলার ১৭ উপজেলায় ৪৩২টি পশুর হাট বসবে। এসব হাটে স্থানীয় খামারি ও প্রান্তিক কৃষকদের পশুই বেশি বিক্রি হবে। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পশু প্রবেশ ঠেকানো ও মহাসড়কে পশুবাহী যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।’
এদিকে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। কুমিল্লা-১০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ বলেন, আমাদের আওতাধীন ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় গরু পাচারের তেমন প্রবণতা নেই। তার পরও ঈদকে সামনে রেখে নিরাপত্তা ও টহল বাড়ানো হয়েছে। দেশীয় খামারিদের স্বার্থরক্ষায় সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
কুমিল্লা জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রমতে, কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশুর মধ্যে গরু, ষাঁড়, বলদ ও মহিষ রয়েছে ২ লাখ ৭১৭টি। এ ছাড়া ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য প্রাণী রয়েছে ৫৮ হাজার ২৮৩টি। এর মধ্যে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলায় ২০ হাজার ৯২৩টি, বুড়িচংয়ে ১৮ হাজার ৭৯৪, বরুড়ায় ১৭ হাজার ৬৪৭ এবং চৌদ্দগ্রামে ১৬ হাজার ৯০৮, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলায় ১৪ হাজার ৫১৭ এবং মেঘনা উপজেলায় ৮ হাজার ৭৩২টি পশু প্রস্তুত রয়েছে।
কুমিল্লা নগরীর কালিয়াজুড়ি এলাকার নূর জাহান এগ্রো ফার্মের মালিক মনির হোসেন বলেন, ‘আমার খামারে এবার ৭২টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাহমা ও শাহীওয়াল জাতের গরুও রয়েছে। গরুগুলোর নাম রাখা হয়েছে বাহুবলী, তুফান, ফাইটার ও মামা-ভাগিনা।’
সদর দক্ষিণ উপজেলার লক্ষ্মীনগর এলাকার রাফি এগ্রো ফার্মে গিয়ে দেখা গেছে, কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে গরু, মহিষ, গয়াল। সেই সঙ্গে বিক্রির জন্য একটি উটও এনেছেন খামার মালিক জুয়েল। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে ৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা মূল্যের গরু রয়েছে।’
বানাসোয়া এলাকার খামারি জামাল হোসেন বলেন, ‘আমার খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে ১০৪টি গরু রয়েছে। মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে থাকা গরুর সংখ্যাই বেশি।’
সদর দক্ষিণ উপজেলার বাগমারা এলাকার খামারি আব্দুল মমিন মিয়া বলেন, অনেক খামারি এখন আধুনিক পদ্ধতিতে গরু পালন করছেন। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পাওয়ায় খামারিরা লাভবান হচ্ছেন। এবার দেশীয়ভাবে উৎপাদিত গরুর চাহিদাই বেশি।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামছুল আলম বলেন, ‘কুমিল্লায় এবার কোরবানির পশুর সংকট নেই। খামারিদের উৎসাহ, সরকারি সহযোগিতা ও তদারকির কারণে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পশু উৎপাদন বেড়েছে। পশুর হাটগুলোয় ৮৪টি ভেটেরিনারি টিম দায়িত্ব পালন করবে। অসুস্থ বা ক্ষতিকর উপায়ে মোটাতাজা করা পশু যেন বাজারে না আসে, সেদিকে কঠোর নজরদারি থাকবে।’