ময়মনসিংহ নগরীর অন্যতম ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা চর কালীবাড়ি। শহরের কেন্দ্রের কাছে হলেও এলাকাটি চরম অবহেলার শিকার। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে এটি এখন এক স্থায়ী জনদুর্ভোগের নাম।
প্রায় ৩০ বছর ধরে শহরের সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিষাক্ত মেডিকেল বর্জ্য এখানে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে চর কালীবাড়ির এই অংশটি এখন ‘ময়লাকান্দা’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
একই স্থানে প্রতিদিন ফেলা হচ্ছে সিটি করপোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের গৃহস্থালি ও বাজারের আবর্জনাও। উন্মুক্ত স্থানে এভাবে ময়লা ফেলায় পুরো এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি।
শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ শহরে ঢোকার প্রধান সড়কের পাশেই এই ময়লাকান্দার অবস্থান। বছরের পর বছর ধরে ময়লা ফেলতে ফেলতে এটি এখন বিশাল এক স্থায়ী ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এর ফলে এলাকায় মশা-মাছির উপদ্রব ব্যাপক বেড়েছে। আশপাশের বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রাক ও ভ্যানে করে ময়লা এনে এখানে ফেলা হচ্ছে। কিছু অসহায় নারী সেই ময়লার স্তূপ উলটেপালটে প্লাস্টিক ও মূল্যবান জিনিস খুঁজছেন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে উৎকট দুর্গন্ধ। পথচারীরা নাক-মুখ চেপে এলাকা পার হচ্ছেন। অনেক যানবাহনের চালকও দুর্গন্ধের কারণে ওই অংশ দ্রুত অতিক্রম করার চেষ্টা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শহরের প্রায় ৩০০ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বর্জ্য এখানে আসে। এর মধ্যে থাকে রক্তমাখা ব্যান্ডেজ, সিরিঞ্জ ও স্যালাইনের পাইপ। এসব বিপজ্জনক বর্জ্য খোলা অবস্থায় পড়ে থাকে। তীব্র দুর্গন্ধে ঘরে থাকা যায় না।
দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চললেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। দ্রুত আধুনিক ইনসিনারেশন প্ল্যান্ট বা বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, ‘শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে জ্বর, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের প্রকোপ অনেক বেড়েছে। বহু পরিবার বাধ্য হয়ে এই নোংরা পরিবেশের মধ্যে বাস করছে। স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের চলাচলে বড় সমস্যা হচ্ছে। একটি আধুনিক নগরীতে এমন চিত্র কোনোভাবেই মানা যায় না।’
স্থানীয় গৃহিণী হাফেজা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ময়লার গন্ধে ঘরে থাকা যায় না। শান্তিতে খাওয়া বা ঘুমানোর উপায় নেই। শিশুদের সব সময় জ্বর ও সর্দি লেগেই থাকে। আধুনিকায়নের অনেক আশ্বাস শুনলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি।
ভোগান্তির কথা জানায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া বিনতে সামাদ। সে বলে, স্কুলে যাওয়ার সময় ময়লার দুর্গন্ধে বমি আসে, মাথা ব্যথা করে। কখনো কখনো ক্লাসে পৌঁছেও শরীর খারাপ লাগে। পড়াশোনায় মন দেওয়া যায় না। বাসায় ফেরার সময় নাকে কাপড় চেপে বা দম বন্ধ করেও এই দুর্গন্ধ থেকে রেহাই পাওয়া যায় না।
পরিবেশবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেডিকেল বর্জ্য দীর্ঘদিন উন্মুক্ত রাখলে মাটি, পানি ও বাতাস মারাত্মক দূষিত হয়। এতে হেপাটাইটিস, ডেঙ্গু ও টাইফয়েডের মতো সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ শিশু ও বর্জ্য সংগ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, হাসপাতালের বর্জ্য প্রথমে হাসপাতালের পাশে জমা রাখা হয়। পরে সিটি করপোরেশনের গাড়িতে করে তা অপসারণ করা হয়। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন।
প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সভাপতি এবং পরিবেশবিদ অধ্যক্ষ লে. কর্নেল (অব.) ডা. মো. শাহাব উদ্দীন বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে সম্পদে পরিণত করা হচ্ছে। অথচ আমরা সেগুলো আগুনে পুড়িয়ে নির্মল বাতাসকে দূষিত করছি।
এর ফলে মিথেন গ্যাসসহ বিভিন্ন গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে মানুষের দেহে প্রবেশ করছে। জটিল সব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মেডিকেল বর্জ্য কখনোই সাধারণ ময়লার সঙ্গে ফেলা উচিত নয়। দ্রুত এই ময়লা আবর্জনাকে পরিশোধনে আধুনিক শোধনাগার নির্মাণ করা উচিত।’
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, কাঁচা ময়লা আবর্জনাগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। শহরের বর্জ্যগুলো যখন সেখানে ফেলা হচ্ছে- সঙ্গে সঙ্গে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সিটি করপোরেশন বিশ্বমানের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আধুনিক ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে।