বর্ষার আগেই কালজানি নদীর কালো রূপ দেখা দিয়েছে। নদীভাঙনে দিশেহারা কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর মানুষ। গত এক সপ্তাহে বিলীন হয়েছে উত্তর ও দক্ষিণ ঢলডাঙ্গার শতাধিক বাড়ি। নদীগর্ভে যাচ্ছে আবাদি জমিও। হুমকিতে রয়েছে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা। নাগেশ্বরী উপজেলার দুধকুমার নদের পাড়ের এলাকার মানুষও একই আশঙ্কায় রয়েছেন। ভাঙন ঠেকাতে নদীপাড়ে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। তবে আতঙ্ক কাটছে না নদীপাড়ের বাসিন্দাদের।
জানা গেছে, উত্তর ধলডাঙ্গা এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার এলাকাজুড়ে নদীভাঙন চলছে। এতে এলাকাটির প্রায় ৮০টি পরিবার ভিটে হারিয়েছে। দক্ষিণ ঢলডাঙ্গা এলাকায় ৩০টির বেশি বাড়ি নদীতে পড়ে গেছে। এই এলাকায় প্রায় ১ হাজার ১০০ মিটার এলাকাজুড়ে নদী ভাঙছে। প্রতিদিন নতুন করে বাড়িঘর বিলীন হচ্ছে।
স্থানীয়দের আবেদন পেয়ে গত শনিবার ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কুদরত-এ-খুদা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জাকির হোসেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বেনজীর রহমান ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ।
উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের ময়েন উদ্দিন বলেন, ‘ভাঙনে জায়গা-জমি নদীতে গেছে। কেউ থাকার জন্য জায়গা দিতে চান না। তাই এখনো ঘর তুলতে পারি নাই।’
গোলজার হোসেন জানান, তারা তিনবার বাড়ি ভেঙেছেন। এবারও যেকোনো মুহূর্তে বাড়ি নদীত পড়ে যেতে পারে। নতুন করে ঘর তোলার জায়গা না থাকায় সরতে পারছেন না।
একই এলাকার মনির হোসেন বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটে আগেই নদীত গেছে। অন্যের জমিতে এই বাড়িতে আছি। সেটিও চলে যাচ্ছে। আর উপায় নাই। কোথায় যাব?’
শিলখুড়ি ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ইউসুফ আলী বলেন, ‘বর্ষার আগেই নদী যেভাবে ভাঙছে, বর্ষা শুরু হলে এলাকাটি থাকবে না মনে হচ্ছে। গত এক বছরে ১০০ মিটারের বেশি ভেতরে এসেছে কালজানি নদী। এক হাজারের মতো পরিবার ভিটে হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। আমরা বিষয়টি জেলা প্রশাসকসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডে বলেছি। তদন্ত করে গেছে। দ্রুত কাজ করার আশ্বাস দিয়েছে। আশা করি কাজ শুরু হবে।’
বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী উত্তর ধলডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয় ও এলাকার বউবাজারও নদীভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে বলে জানান সাবেক জনপ্রতিনিধি।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘নদীভাঙন প্রতিরোধে উত্তর ও দক্ষিণ ঢলডাঙ্গায় জরুরি কাজ শুরু হয়ে গেছে। অন্য ভাঙনকবলিত পয়েন্টগুলোকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এরপর বরাদ্দ চাওয়া হবে। বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু করা হবে।’
এদিকে বর্ষার আগেই দুধকুমার নদের পাড়ের অবস্থাও একই রকমের। নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে নাগেশ্বরী উপজেলার নুনখাওয়া ইউনিয়নের চরকাপনা এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ও আবাদি জমি। ভাঙনের মুখে পড়েছে মাদ্রাসা, মসজিদ, বাজারসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
ভাঙন প্রতিরোধের দাবিতে শনিবার বিকেলে নদী পাড়ে শত শত মানুষ উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভ করেছেন। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংসদ সদস্যের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
চর আউলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু তাহের মাস্টার বলেন, ‘বাড়িঘর যেভাবে ভাঙছে তাতে প্রাইমারি স্কুলটি এ বছরে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি না থাকলে এই এলাকার ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।’
এসব বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। আর যেন নতুন করে কেউ ভাঙনের শিকার না হন, সেই ব্যবস্থা করা হবে। ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হবে।’
প্রাথমিকভাবে দুই হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘প্রয়োজনে আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে।’