‘ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার’ কারখানায় ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই থেকে শতভাগ ইউরিয়া সার উৎপাদন হচ্ছে। তারপরও প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে না। এখনো ১৩ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। দুবার সংশোধন করে ২০২৬ সালের জুনে শেষ করার কথা। কিন্তু সে ব্যাপারেও শঙ্কা রয়েছে। কারণ এখনো রেললাইন নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি। আবাসনের জন্য বিল্ডিং নির্মাণেও নেই অগ্রগতি। কেন প্রকল্পের ধীরগতি তা জানার জন্য গত ১৪ আগস্ট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত (এডিপি) ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনাবিয়ষক প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্প পরিচালকের কাছে ধীরগতির কারণ জানতে চাওয়া হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিসিআইসি। নরসিংদী জেলার পলাশে সার কারখানাটি করা হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিস্ট সূত্র জানায়, কৃষকের কাছে ইউরিয়া সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে, দেশে ইউরিয়া সারের আমদানি কমাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখানাকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যাতে চাহিদামতো দৈনিক ২ হাজার ৮০০ টন বা বছরে ১০ লাখ টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করা যায়। এরই অংশবিশেষ ২০১৯ সালের ১৯ জুনে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে। প্রকল্পের প্রধান কাজ ধরা হয় ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন, রেললাইন স্থাপন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসনের জন্য বিল্ডিং নির্মাণ, সড়ক প্রশস্তকরণ, গ্যাসলাইন স্থাপন, আসবাবপত্র কেনা, গবেষণাগার ও অফিস সরঞ্জাম কেনা। এ ছাড়া অগ্নিনির্বাপক গাড়ি ও যন্ত্রপাতি কেনা, কম্পিউটার সফটওয়ার কেনাসহ অন্যান্য কাজও রয়েছে।
প্রকল্পের কাজও শুরু হয়। কিন্তু ঠিকমতো এগোয়নি কাজ। ফলে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সংশোধন করে খরচ বাড়িয়ে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় আনা হয়েছে। এক লাফে খরচ বাড়ানো হয়েছে ৫ হাজার ৩৯ কোটি টাকা বা ৪৮ শতাংশ। একই সঙ্গে সময়ও বাড়ানো হয় দুই বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সব কাজ শেষ হলে ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর সার কারখানাটির উদ্বোধন করা হয়। তবে গ্যাসসংকটসহ নানাবিধ কারিগরি জটিলতায় পুরোপুরি উৎপাদনে যেতে পারেনি। অবশেষে গত বছরের ১৩ জুলাই কারখানায় শতভাগ সার উৎপাদনের উদ্বোধন করা হয়। শতভাগ উৎপাদন শুরু হওয়ায় বর্তমানে দৈনিক ২ হাজার ৮০০ টন এবং বছরে ১০ লাখ টন সার এ কারখানা থেকে পাওয়া যাচ্ছে।
কিন্তু কারখানা থেকে উৎপাদিত সার দেশের অন্য এলাকায় পৌঁছার জন্য যে রেললাইন নির্মাণ করার কথা তার কিছুই হয়নি। বিল্ডিং নির্মাণের কাজও বাকি থাকায় ২০২৪ সালে ৫ জানুয়ারি মাসে খরচ ছাড়া দ্বিতীয়বার সংশোধন করে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অর্থাৎ আবার দুই বছর সময় বাড়ানো হয়েছে। গত জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের মোট খরচ হয়েছে ১৩ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা বা ৮৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আর বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৯১ শতাংশ। দীর্ঘ সাত বছরে রেললাইন নির্মাণের মাত্র টেন্ডার হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের সময় রয়েছে মাত্র ১০ মাস। এই সময়ে আবাসনের জন্য বিল্ডিং নির্মাণ ও রেললাইন নির্মাণের কাজ শতভাগ বাস্তবায়নে শঙ্কা রয়েছে। কারণ প্রায় ৮০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য ৬৯টি বিল্ডিং নির্মাণ করা হবে। এগুলোর কেবল স্ট্রাকচারাল ফাউন্ডেশনের কাজ চলছে। পুরো কাজ শেষ করা সম্ভব না।
সার্বিক ব্যাপারে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৯১ শতাংশ। এক বছরের বেশি সময় ধরে শতভাগ ইউরিয়া সার উৎপাদন হচ্ছে। দৈনিক ২ হাজার ৮০০ টন সার উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু এই সার সারা দেশে পৌঁছার জন্য পলাশের এই সার কারখানা থেকে যে রেললাইন নির্মাণের কথা তা হয়নি। কেবল টেন্ডার হয়েছে। তারা জমি অধিগ্রহণ করে কাজ শুরু করবে। আবাসনের জন্য বিল্ডিং নির্মাণ করা হচ্ছে। ফাউন্ডেশনের কাজ চলছে।’
সময় বাকি মাত্র ১০ মাস। এই সময়ে বাকি কাজ সম্ভব কি? এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘যেটা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দৈনিক ২ হাজার ৮০০ টন সার উৎপাদন করা, সেটা এক বছরের বেশি সময় থেকে শতভাগ হয়েছে। সার উৎপাদন হচ্ছে। তবে রেললাইন নির্মাণ ও বিল্ডিং নির্মাণের কাজ শেষ হবে কি না, সেটা বলা যাচ্ছে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি প্রকল্পের পুরো কাজ দ্রুত শেষ করতে।’