জলবায়ুঝুঁকি সামাল দিতে কৃষকের উৎপাদিত ফসলকে বিমার আওতায় আনতে বিমা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ‘ক্লাইমেট রিস্ক ইন্স্যুরেন্স (সিআরআই)’ বা জলবায়ুঝুঁকি বিমার গাইডলাইন তৈরির কাজ শুরু করার কথা জানিয়েছেন বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান আসলাম আলম। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনগত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ফসলের বিপরীতে কৃষককে আর্থিক নিরাপত্তা দিতে এই বিমা কাজ করবে।’
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের জন্য আয়োজিত ‘এনহান্সিং মিডিয়া ক্যাপাসিটি অন ক্লাইমেট রিস্ক ইন্স্যুরেন্স’ শীর্ষক কর্মশালায় তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ তাদের ঘরবাড়ি এবং জীবিকা হারাচ্ছে। এ কারণেই শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা এবং টেকসই বিমাব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত বিমা ক্ষতির ওপর নির্ভর করে হয়, তবে জলবায়ু পরিবর্তনগত ঝুঁকিগুলো ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর জন্য প্যারামেট্রিক বা আবহাওয়াভিত্তিক বিমা প্রয়োজন। এটির আইনি স্বীকৃতি নেই বাংলাদেশে। নীতিমালা হলে স্বীকৃতি মিলবে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ফসলের বিমা করতে আইনিসহ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কৃষি আবহাওয়াসংক্রান্ত শক্তিশালী তথ্য ভাণ্ডার, প্রযুক্তি ও একাধিক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় একটি চ্যালেঞ্জ।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহযোগিতায় যৌথভাবে কর্মশালাটি আয়োজন করে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, ইআরএফ ও অক্সফাম ইন বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে আবহাওয়া সূচকের তথ্যর ওপর নির্ভর করে বিমা করার আইনি কোনো স্বীকৃতি নেই। সারা দেশে কোন এলাকায় কতটুকু বন্যা হয় বা হবে, তার কোনো তথ্য ভাণ্ডার নেই। অতিশীত, অতিবর্ষা বা তাপ ও বাতাসের প্রবাহে কখন কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে তাও বলা সম্ভব না। আবহাওয়া বিরূপ হলেই যে ফসলের ক্ষতি হয় তাও নির্ণয় করা জটিল। এসব কারণে কোনো এলাকার ফসলের বিমা করা সহজসাধ্য নয় মন্তব্য করে আসলাম আলম বলেন, ‘বিমা প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে আইডিআরএর পাশাপাশি আবহাওয়া অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।’
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিশ্বের অন্যতম একটি জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে। শীতের স্থায়িত্ব কমেছে ১৫ দিন, যা কৃষি ও জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।’
কর্মশালায় জলবায়ু পরিবর্তনগত কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রভাব নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশে অক্সফামের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাফিসা তাসনিম খান।
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে একটি। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বারবার জলবায়ু দুর্যোগের মুখোমুখি হয়।
এতে ক্ষতির পরিমাণ হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আনুমানিক ১ শতাংশ। জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ সাধারণ বিমার আওতায় থাকায় লাখো মানুষ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং খরার কারণে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংস্থাটি বিশ্বব্যাংক ও দাতা সংস্থার সহায়তায় পরীক্ষামূলকভাবে কুড়িগ্রামের চারটি ইউনিয়নের ২০ হাজার কৃষককে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি থেকে রক্ষায় বিমার আওতায় এনেছে। এই বিমার প্রিমিয়ামের অর্থ পরিশোধ করছে দাতা সংস্থাগুলো।
অনুষ্ঠানে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ুঝুঁকি মোকাবিলায় ক্লাইমেট রিস্ক ইন্স্যুরেন্স এখন আর বিকল্প নয় অপরিহার্য। জাতীয় নীতি, গণমাধ্যম এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগে বিমাব্যবস্থাকে সহজ, বিশ্বাসযোগ্য ও জনগণকেন্দ্রিক করতে পারলেই বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়নে আঞ্চলিক নেতৃত্বের উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারবে।
বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি বাংলাদেশের নীতি (কর্মসূচি) বিভাগের কর্মকর্তা নুরুল আমিন বলেন, ‘সিআরআইর মাধ্যমে, আমরা দুর্যোগ প্রতিক্রিয়ায় পূর্বাভাস দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করছি—এবং এটি জানাতে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিমার আওতায় আসলে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সাহায্যের জন্য কারও অপেক্ষা করতে হবে না।’
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা বলেন, ‘আমরা যারা অর্থনীতি বিষয়ে সাংবাদিকতা করি তারা আর্থিক খাত ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করি। এখন সময় এসেছে জলবায়ু বিমার প্রকল্পগুলোকে কেবল উন্নয়নের পাইলট হিসেবে নয়, বরং জনগণের জন্য আর্থিক ন্যায়বিচার হিসেবে গ্রহণ করার।’
বাংলাদেশে অক্সফামের জলবায়ু বিচার ও প্রাকৃতিক সম্পদ অধিকার বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ এমরান হাসান বলেন, ‘জলবায়ু উচ্চঝুঁকিতে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা জলবায়ু সংকটটি তৈরি করেনি—তবে তাদের সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হবে। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, বিমা সুবিধাটি দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাবে, গণমাধ্যম সেই রূপান্তরকে এগিয়ে নিতে পারে।’