সরকারি চাকরি থেকে সদ্য অবসরে গেছেন গোপীনাথ প্রসাদ। অবসর জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার পরিচালনার জন্য পেনশনসহ যে টাকা পাবেন, তা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সেই টাকা পাওয়ার আগেই সঞ্চয়পত্রের মুনাফা আরেক দফা কমিয়ে দিয়েছে সরকার। ফলে সংসার খরচ চালানোর চিন্তায় তার কপালের ভাঁজ কিছুটা বেড়ে গেল।
তিনি বলেন, ‘আমার মতো অবসরভোগীদের নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা হচ্ছে সঞ্চয়পত্র। কিন্তু সরকার যেভাবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়ে দিচ্ছে, তাতে তো সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে যাবে। কেননা এখন তো আমার অন্য কোনো আয় নেই।’
ছয় মাসের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার আরেক দফা কমানোয় নতুন বছরের শুরুতেই গোপীনাথ প্রসাদের মতো দেশের অধিকাংশ মধ্যবিত্তের চাপ বেড়ে গেল।
মুনাফার হার কমিয়ে আগামী ছয় মাসের জন্য সঞ্চয়পত্রের নতুন মুনাফার হার ঘোষণা করেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকেই নতুন মুনাফার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলেরও (আইএমএফ) চাপ রয়েছে।
নতুন হার অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার হবে ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন মুনাফার হার হবে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। গত জুলাই মাসেও মুনাফার হার কমানো হয়েছিল। তখন সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন মুনাফার হার ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ ছয় মাসে মুনাফার হার কমেছে ১ শতাংশেরও বেশি। এর আগে, গত জানুয়ারিতে সুদহার কিছুটা বাড়ানো হয়েছিল। অর্থাৎ প্রতি ছয় মাস পরপর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
একদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়নি। অন্যদিকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। যদিও কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা ৮-৯ শতাংশের ঘরেই আছে। সেই সঙ্গে এখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হারও কমানো হলো। ফলে সামগ্রিকভাবে নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ কিছুটা বাড়বে। বিশেষ করে যাদের পারিবারিক খরচের বড় একটি অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে আসে, তারা বড় ধরনের চাপে পড়বেন। এ ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমায় মধ্যবিত্তরা, বিশেষ করে যারা এই আয়ের ওপর নির্ভর করে জীবন নির্বাহ করেন, তারা বড় ধরনের চাপে পড়বেন। কারণ বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে তাদের ব্যয় আরও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার সঞ্চয়পত্রের চেয়েও বেশি এবং সেটিও নিরাপদ বিনিয়োগ। সেখানে সরকারের গ্যারান্টিও আছে। ফলে চাইলেই সাধারণ মানুষ সেখানে বিনিয়োগ করতে পারেন। তারা আরও বলেন, সুদহার সামান্য বাড়ালে বা কমালেই যে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ বাড়বে বা কমবে- এটা ঠিক নয়। বর্তমানে স্থিতিশীল উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে অধিকাংশ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। এই অবস্থায় তাদের পক্ষে নতুন করে সঞ্চয় বা বিনিয়োগ কোনোটাই করার সামর্থ্য নেই। বরং আগে বিনিয়োগ করা সঞ্চয়পত্র ভেঙে খাচ্ছেন অনেকে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, অবসরভোগী এবং সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভর করে দেশের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার সংসার চালায়। মুনাফার হার বারবার কমানোর ফলে তাদের ভোগান্তি বাড়বে।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে বিনিয়োগ, মজুরি এবং শ্রমবাজার, কোথাও খুব বেশি সুখবর নেই। শুধু রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি আয় বাদে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কোনো খাতেই আয় বাড়ছে না। অন্যদিকে স্থিতিশীল রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। অর্থাৎ মানুষের আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে। এই অবস্থায় নতুন করে সঞ্চয় করার মতো সক্ষমতা অধিকাংশ মানুষেরই নেই। অর্থাৎ মুনাফার হার বাড়ানোর পরও যেমন সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ বাড়েনি, এখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর পরও সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ খুব বেশি কমবে না।’
এমন পরিস্থিতিতে সরকার তাহলে কেন সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়েছে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রে যে সংস্কার করা হয়েছে, সেটি সুদহার বাজারভিত্তিক করার উদ্দেশ্যে। সুদহার কমানোর জন্য নয়। কারণ সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি ঋণ না নিতে আইএমএফেরও পরামর্শ রয়েছে।’
একই বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর ফলে মধ্যবিত্তের ওপর কিছুটা চাপ বাড়বে। তবে বর্তমানে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার অনেক বেশি। মধ্যবিত্ত চাইলে সেখানে বিনিয়োগ করতে পারে। এটিও সঞ্চয়পত্রের মতোই নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা। সেখানে সরকারের গ্যারান্টিও আছে।
জানা গেছে, আইএমএফের পরামর্শে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাজারভিত্তিক করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদহারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ছয় মাসের গড় ট্রেজারি বিলের সুদহারের ভিত্তিতে সঞ্চয়পত্রের সুদহার নির্ধারিত হবে। ট্রেজারি বিলের সুদহার বাড়লে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাড়বে। আর ট্রেজারি বিলের সুদহার কমলে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমবে। যদিও বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের চেয়ে ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার তুলনামূলক বেশি। এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. রওশন আরা বেগম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রের সুদহার নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয়। ফলে তারাই এ বিষয়ে ব্যখ্যা দিতে পারবেন। আমাদের কাছে কোনো ব্যাখ্যা নেই।’
একই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাজারভিত্তিক করা হয়েছে। অর্থাৎ ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহারের সঙ্গে সমন্বয় করেই সঞ্চয়পত্রের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে সঞ্চয়পত্রের সুদহার সামান্য কমানো হয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলারের যে ঋণচুক্তি রয়েছে, সেখানেও সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ কমানোর পরামর্শ রয়েছে। আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিবছর বাজেট ঘাটতি হিসেবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকার যে পরিমাণ ঋণ করে সঞ্চয়পত্র থেকে এক-চতুর্থাংশের বেশি ঋণ নিতে পারবে না। সেই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাজারভিত্তিক করতে হবে।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার কম। এ ক্ষেত্রে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ পরিমাণ বা এর কম হলে মুনাফার হার বেশি হবে। ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার কমে আসবে।
নতুন মুনাফার হার
দেশে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীন যত ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্র। এ সঞ্চয়পত্রে এতদিন সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ; এখন তা কমিয়ে করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে এ মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ, সেটা কমিয়ে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ করা হয়েছে।
পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পঞ্চম বছর শেষে, অর্থাৎ মেয়াদপূর্তিতে মুনাফা ছিল ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ; এখন তা করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ।
পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হারও কমানো হয়েছে। এ সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ।
এ ছাড়া তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলেও মুনাফা কমবে। এ সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
এ ছাড়া ১ জুলাই ২০২৫-এর আগে ইস্যু হওয়া সব জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের ইস্যুকালীন মেয়াদে ওই সময়ের মুনাফার হার প্রযোজ্য হবে। তবে পুনর্বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পুনর্বিনিয়োগের তারিখের মুনাফার হার প্রযোজ্য হবে। ছয় মাস পর মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ করা হবে।