সাতক্ষীরায় শুরু হয়েছে চলতি মৌসুমের আম সংগ্রহ। জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী গত সোমবার ভোর থেকেই জেলার বিভিন্ন বাগানে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ ও বোম্বাই জাতের আম পাড়ার কার্যক্রম শুরু হয়। বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন চাষিরা।
সাতক্ষীরা দেশের অন্যতম আগাম আম উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিত। ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত সুবিধার কারণে এখানে আম আগে পাকে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত সরবরাহ করা যায়। ফলে সাতক্ষীরার আমের বাজারে আলাদা চাহিদা রয়েছে। তবে উৎপাদনের এই সম্ভাবনার বিপরীতে বাজার কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে চাষিদের মধ্যে।
চাষিদের অভিযোগ, জেলার প্রধান পাইকারি বাজার ‘বড় বাজার’-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে তারা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিকল্প পাইকারি বাজার বা আড়ত না থাকায় বাধ্য হয়েই এখানে আম বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। ফলে একক বাজার নির্ভরতা তৈরি হওয়ায় দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
ফিংড়ি এলাকার আমচাষি আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ বছর ফলন ভালো হলেও বাজারে গিয়ে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম কম হওয়ায় অনেক সময় লোকসান গুনতে হয়। তিনি জানান, সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবার লাভের হিসাব আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিকল্প বাজার ব্যবস্থা থাকলে কৃষকরা সরাসরি ভালো দামে বিক্রি করতে পারতেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দেবহাটার চাষি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এককেন্দ্রিক বাজার ব্যবস্থার কারণে তারা বাধ্য হয়েই বড় বাজারে আম বিক্রি করেন। এতে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে চাষিদের ওপর। বাজারে প্রতিযোগিতা না থাকায় অনেক সময় দাম ওঠানামা করে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত চাষিদের হাতে থাকে না বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
কালীগঞ্জের নুর ইসলাম গাজী বলেন, কৃষি উৎপাদনে খরচ দিন দিন বাড়ছে। সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় বাজারে আমের দাম না পাওয়ায় চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তিনি বলেন, উৎপাদন ভালো হলেও ন্যায্য বাজার না থাকলে কৃষকের লাভ হয় না।
এদিকে মৌসুম শুরুর প্রথম দিনেই স্থানীয় বাজারে আম বিক্রি হয়েছে মণপ্রতি প্রায় ১৫০০ থেকে ২২০০ টাকায়। তবে এই দাম নিয়ে চাষিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ কেউ প্রাথমিক দামে সন্তুষ্ট হলেও অধিকাংশই বলছেন, এটি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
চাষিরা আরও বলছেন, জেলার প্রধান সমস্যা হলো বাজার কাঠামোর সীমাবদ্ধতা। পুরো জেলার আম বিক্রির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে মাত্র একটি বড় পাইকারি বাজার। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও বিক্রির জায়গা সীমিত, যা এক ধরনের চাপ তৈরি করে। বিকল্প পাইকারি বাজার বা আড়ত না থাকায় প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় বলে অভিযোগ তাদের।
অন্যদিকে অনলাইন উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান সময়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সরাসরি ক্রেতার কাছে আম পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কিছুটা কমে এবং কৃষকের লাভের সুযোগ বাড়ে। অনলাইন উদ্যোক্তা মৃত্যুঞ্জয় সরকার বলেন, অনলাইন মাধ্যমে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরাসরি অর্ডার নিয়ে আম সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে কৃষকরা তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন এবং বাজার নির্ভরতা কিছুটা কমছে।
আরেক অনলাইন উদ্যোক্তা জনি হোসেন বলেন, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে সাতক্ষীরার আম দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি হলে সিন্ডিকেট নির্ভরতা কমবে এবং বাজার আরও বিস্তৃত হবে। তবে এর জন্য লজিস্টিক সুবিধা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, সাতক্ষীরার আমের বাজার সম্প্রসারণে কৃষিবিভাগ কাজ করছে। এছাড়া কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ, পরিচর্যা এবং বাজার সংযোগে সহায়তা করা হচ্ছে, যাতে তারা ন্যায্য মূল্য পান। তিনি জানান, কৃষি বিভাগ নিয়মিতভাবে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে এবং উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মানসম্মত আম বাজারজাতের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের বাইরে আম সংগ্রহ এবং কেমিক্যাল ব্যবহার করে পাকানোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক বিষ্ণুপদ পাল বলেন, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আম সংগ্রহ ও বাজারজাত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই কেমিক্যাল ব্যবহার বা বাজারে অস্বচ্ছতা তৈরি করা যাবে না। অনিয়ম পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নিরাপদ আম ভোক্তার কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা হবে।
এবার জেলায় প্রায় ৪ হাজার ১৩৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের এই বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিকল্প বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চাষিরা বলছেন, উৎপাদনের সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন তারা ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং বাজারে সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।