শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক দিন থেকে নৈরাজ্য চলছে। গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে শিক্ষাঙ্গনে কখনও শান্ত-সুস্থির পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরটি প্রায় লাগাতারভাবে অস্থির হয়ে আছে। এর প্রভাব পড়ছে রাজধানীর জনজীবনে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশকেও বিপর্যস্ত করে তুলছে। এখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে চলছে একধরনের স্থবিরতা। এতে অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এ নিয়ে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
মূলধারার শিক্ষার দুই স্তরে এখন সংকট চলছে। সারাদেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বুধবার থেকে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষকদের সংগঠন। তারা বিবৃতিতে বলেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের তিন দফা দাবি বাস্তবায়নে ২২ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এই অগ্রগতি মানে, তাদের দাবি পূরণ হয়নি, সরকার পূরণের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উপরন্তু আন্দোলনে থাকা কয়েকজন শিক্ষককে শোকজ করেছে।
তিন দাবিতে প্রাথমিক শিক্ষকরা শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছে। এই দাবিগুলো হচ্ছে সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল দশম গ্রেডে নির্ধারণ, চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির বিষয়ে জটিলতার অবসান ঘটানো এবং সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি প্রদান। এসব দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকরা আন্দোলনে আছেন। এর আগে ঢাকার শাহবাগে তারা আন্দোলন তীব্র করলে পুলিশ লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং জলকামান ব্যবহার করে শতাধিক শিক্ষককে আহত করে। সরকার এই আন্দোলনের মুখে তখন দাবিগুলো মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু তা পূরণ না হওয়ায় শিক্ষকরা প্রথমে কর্মবিরতি এবং এখন কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছে। এর অংশ হিসেবে তারা ‘লাগাতার পরীক্ষা বর্জন’ করছেন, অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের বার্ষিক বা চূড়ান্ত পরীক্ষা নিচ্ছেন না। তারা বলছেন, সরকার প্রতিশ্রুত দাবিগুলো বাস্তবায়ন করলে তারা শ্রেণিকক্ষে ফিরে গিয়ে পরীক্ষা নেবেন।
প্রাথমিক শিক্ষকদের পাশাপাশি মাধ্যমিক শিক্ষার শিক্ষকরাও আন্দোলন আছেন। নবম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ, দ্রুত স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠনসহ চার দাবিতে তাদের চলমান কর্মসূচি ‘আপাতত স্থগিত’ করেছেন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, বার্ষিক পরীক্ষা শেষে সরকারকে দাবি মানতে তারা কিছুদিন সময় দেবেন। দাবি মানা না হলে আবারও আন্দোলনে নামবেন তারা। মাধ্যমিক শিক্ষকদের দাবির মধ্যে আছে সহকারী শিক্ষক পদকে নবম গ্রেডে উন্নীত করে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের অন্তর্ভুক্তি এবং মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গেজেট প্রকাশ, বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় নিয়োগ ও পদোন্নতি দ্রুত বাস্তবায়ন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভিত্তিতে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের বকেয়া প্রদান এবং ২০১৫ সালের আগের ইনক্রিমেন্টসহ অগ্রিম বেতন পুনর্বহাল করা।
আপাতত স্বস্তি এই যে, মাধ্যমিকের শিক্ষকরা আন্দোলনে থেকেও পরীক্ষা নেবেন। কিন্তু দাবি পূরণ না হলে এই স্বস্তি যে স্থায়ী হবে না, সেকথা বলাই বাহুল্য।
সরকার শিক্ষাকে সুশৃঙ্খল ও সুস্থির করতে ব্যর্থ হচ্ছে। দাবি-দাওয়া নিয়ে শিক্ষকরা যখন আন্দোলনে নামেন সরকার তখন গা করে না। আন্দোলন ঘনীভূত নিম্নচাপে রূপ নিলে নড়েচড়ে বসে। প্রাথমিকভাবে প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু পরে আর তা বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।
আসলে শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে যেসব সংকট চলছে তা নিরসনের জন্য সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। এজন্যে সরকার একটা সংকট নিরসন কমিশন গঠন করতে পারে। সেই কমিশনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের স্থায়ী পথ খুঁজে বাস্তবায়িত করাই হবে দূরদর্শী কাজ। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি এতটাই মন্থর যে, জনজীবনে আন্দোলনের তীব্র নেতিবাচক অভিঘাত পৌঁছুনোর আগ পর্যন্ত কিছুই করে না। এই মন্থরতা, সুশাসনের অনুকূল নয়। বিস্ময়কর হচ্ছে, প্রবল দাবির মুখেও সরকার শিক্ষার মতো এরকম গুরুত্বপূর্ণ খাতের সংস্কারে একটা শিক্ষা কমিশন পর্যন্ত গঠন করেনি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় সরকার শিক্ষাসংকট দূর করার জন্য পুরোপুরি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
পরিস্থিতি এরকম চলতে থাকলে, শিক্ষাক্ষেত্রে যে সংকট চলছে তা আরও ঘনীভূত হবে আর তাতে ক্ষতি হবে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবন বিপন্ন হয়ে পড়বে। তখন সেই আপ্তবাক্যটি – শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড – পুরোপুরি প্রহসনে পরিণত হবে। তবে তার আগেই শিক্ষার সাম্প্রতিক সংকটগুলো দূর করার ব্যবস্থা নিতে হবে।