ঢাকা ২ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
আত্মঘাতী গোলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয়বঞ্চিত মিসর ২৬ বছরে অভিষেক, বিশ্বকাপে স্পেনকে স্তব্ধ করে দেওয়া কে এই গোলরক্ষক? প্রথমার্ধে বেলজিয়ামের বিপক্ষে এগিয়ে মিসর বিশ্বকাপ ইতিহাসে নাম লেখালেন ভোজিনিয়া-ইয়ামাল শক্তিশালী স্পেনকে রুখে দিল নবাগত কেপ ভার্দে বিশ্বকাপ অভিষেকে রেকর্ড গড়ল কেপ ভার্দে দুই ছেলের নামে ২ ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে যা জানালেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মানবিক রাষ্ট্র গঠনে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী প্রথমার্ধে স্পেনকে আটকে দিল কেপ ভার্দে চট্টগ্রামে মেরিন সার্ভেয়ারদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত মতলবে বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যার প্রধান আসামি গ্রেপ্তার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিকে স্বাগত জানাল বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যে ১৬ বছরের নিচে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ বিশ্বকাপে শুরুতেই বড় হার, ম্যাচ শেষ হতেই কোচ বরখাস্ত নবজাতকের মরদেহ টানাটানি করছিল কুকুর, উদ্ধার করল পুলিশ গোপালগঞ্জে যৌতুকের জন্য স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হুইলচেয়ারে মাঠ ছাড়লেন কুবো, জাপান শিবিরে উদ্বেগ মৌলভীবাজারে তিন মাসের ভোগান্তির পর চিকিৎসাসেবা পেল চা-বাগানবাসী শার্শায় প্রবাসীর স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ৩ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামেও বসবে এআই ক্যামেরা: চসিক মেয়র স্পেনের একাদশে নেই ইয়ামাল ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত জন প্রত্যাশা পূরণ হয়নি’ রাজশাহীকে বাসযোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত শহর গড়ার প্রত্যয় আরডিএ’র নতুন চেয়ারম্যানের কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনই হোক অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তি শ্রমিকদের ‘চাকরি’ স্থায়ী করুন রাজনীতিকে সরল সমীকরণে দেখা যায় না ইস্তিগফারের এমন ক্ষমতা জানলে আপনি অবাক হবেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সালিশ বৈঠকে প্রতিপক্ষের হামলায় শ্রমিক দল নেতা নিহত জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী পর্তুগালের পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কিশোর আইসিইউতে
Nagad desktop

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে গড়ে তুলতে হবে মহান বিজয় দিবস

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৫১ পিএম
মহান বিজয় দিবস

আজ ১৬ ডিসেম্বর। আমাদের বিজয় দিবস। অহংকার ও গৌরবের মুহূর্ত। বাংলাদেশের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম সোনালি দিন। হাজার বছর ধরে বাঙালির যে আকুতি ছিল, আকাঙ্ক্ষা ছিল স্বাধীনতার, এই দিনেই তা অর্জিত হয়। এ জন্য দীর্ঘ নয় মাস এ ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীকে সশস্ত্র সংগ্রাম করতে হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রায় ৯১ হাজার ৬৩৪ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
স্বাধীনতার তাৎপর্য অপরিসীম। এ অঞ্চলের মানুষ যে নানান সূত্রে এক ও অভিন্ন, স্বাধীনতার মধ্যদিয়ে তার প্রতিষ্ঠা ঘটে, উন্মেষ ঘটে বাঙালি জাতিসত্তার। সেই জাতীয়তাবাদ উগ্র ছিল না, ছিল উদার গণতান্ত্রিক। এরকম একটা রাষ্ট্রের স্বপ্ন থেকেই জন্ম হয় বাংলাদেশের। একদিনে এ বোধে পৌঁছায়নি এ দেশের মানুষ। 
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়। ‘মুসলিম’ ভাবধারায় পূর্ব ও পশ্চিম, হাজার মাইলের দূরবর্তী দুই ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু পরবর্তী দীর্ঘ ২৫ বছরে এ দেশের মানুষ নানা বঞ্চনা ও সংগ্রামের মধ্যদিয়ে উত্তীর্ণ হয় ‘বাঙালি’ জাতিসত্তার বোধে। বাংলাদেশের বাঙালিদের এ বোধটা প্রথম এসেছিল ভাষার সূত্রে। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম করতে গিয়ে তারা বুঝেছিলেন, হাজার মাইল দূরের ভূখণ্ডে বসবাস করা পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে তার কোনো ঐক্য বা মিল নেই; কী ভাষায়, কী সংস্কৃতিতে, কী জীবনযাপনে। উপরন্তু ছিল সীমাহীন বঞ্চনা। পাকিস্তানি শাসনক্ষমতায় সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের। এ বঞ্চনার বিরুদ্ধে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলন গড়ে তোলেন। শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে ‘ছয় দফা’ দাবি তুলে ধরেন। এতে বাঙালিদের সার্বিক মুক্তির রূপরেখা তুলে ধরা হয়। সামগ্রিকভাবে মূল দাবিটা ছিল স্বাধিকারের, অর্থাৎ নিজেদের অধিকার আদায়ের। এ আন্দোলন মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের এতটাই সমর্থন পেয়েছিল যে, তৎকালীন পাকিস্তানি শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের তখততাউস কেঁপে ওঠে। আন্দোলনে ভীত হয়ে জেনারেল আইয়ুব সামরিক শাসন জারি করেন। এতে বাঙালিদের সংগ্রাম স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে ঘটে যায় গণ-অভ্যুত্থান। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানি মুজিবের মুক্তির আন্দোলনে সমর্থন দেন। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে পতন ঘটে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের। ক্ষমতার আসনে বসেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আরেক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান। ক্ষমতায় বসেই তিনি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। জনরায়ই হোক শেষ কথা। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। মুজিবের এ বিজয়ে শাসনক্ষমতা যে বাঙালিদের হাতে চলে আসছে, একথা বুঝতে পেরে ইয়াহিয়া ক্ষমতা হস্তান্তরে গরিমসি করতে থাকেন। 
এল একাত্তরের মার্চ। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে অসহযোগের ডাক দিলেন বঙ্গবন্ধু। ভেতরে ভেতরে আরেক দিকে চলছিল সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি। এরপর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা ‘অপারেশন সার্চলাইটে’-এর নামে গণহত্যা শুরু করলে শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধ। মুক্তির চূড়ান্ত লড়াই। টানা নয় মাসের যুদ্ধে বাঙালি বিজয় অর্জন করে। এই ডিসেম্বর মাসেই ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার সূর্য।  


অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় হয়ে গেল বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। স্বাধীনতার মূল কথা ছিল মানুষের সার্বিক মুক্তি। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়- এ দেশের মানুষ যাতে সব ধরনের অধিকার পায়, আত্মবিকাশের সুযোগ উন্মুক্ত হয়; সেটাই ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল অনুপ্রেরণা। সেই লক্ষ্য যে পূরণ হয়নি, সব ধরনের সূচক এবং আমাদের জীবনযাপনে তা স্পষ্ট। চব্বিশের অভ্যুত্থানও হয়েছিল এই একই অনুপ্রেরণায়। কিন্তু ইতোমধ্যে দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। কাগুজে সংস্কারের কথা শোনা গেছে, বাস্তবে কিছুই ঘটেনি। এমনকি এই মুহূর্তে সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হবে কি না, সে বিষয়েও বাংলাদেশের অনেক মানুষ সন্দিহান। 
ইতোমধ্যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ও দেখা দিয়েছে। যে স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, ধর্ষণের শিকার হয়েছিল ২ লাখ নারী, অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্যদিয়ে প্রথমে ২৪ বছর এবং পরে নয় মাস ধরে সংগ্রাম করতে হয়েছিল; সেই স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। দেশের নানা স্থানে ছড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রায় সব স্মারক গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা। 
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বেড়েছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি। সম্প্রতি আইনশৃঙ্ক্ষলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। সাধারণ মানুষ একদিকে খেয়েপড়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে, অন্যদিকে ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়। এরকম রাষ্ট্র কখনই কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র হোক যেখানে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারেন। 
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার অশুভ প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের মৌল আদর্শ- সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা ও উদার গণতান্ত্রিক ধারায় দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ে তুরতে হবে- এটাই হোক অঙ্গীকার।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০১:১১ পিএম
বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে

জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট উত্থাপিত হয়েছে। এবার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার আগের অর্থবছরের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। আর পয়েন্ট টু পয়েন্ট হিসাবে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, যা এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতির ইঙ্গিত দেয়। প্রস্তাবিত বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। মূল্যস্ফীতি কমানো নিয়ে অর্থমন্ত্রী বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তিনি বলেছেন, বাজার বা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারি লোক দিয়ে পিটিয়ে করার বিষয় না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সঠিক নীতি, ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ব্যবসায় খরচ কমাতে হবে। এতে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে মানুষের আয় বাড়বে। বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়বে। আর এভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমানোর ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)ও বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলন করেছে। টানা চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নতুন অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার যে লক্ষ্য ঠিক রেখেছে বিএনপি সরকার, তা পূরণে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে সিপিডি।

সিপিডির মতে, দেশের মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহজনিত; যা শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ব্যয়ের মাধ্যমে যদি উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ে, তাহলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা টেকসইভাবে উন্নত হবে। অন্যথায় অতিরিক্ত ব্যয় কেবল মূল্যস্ফীতির চাপই বাড়াতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে রাজস্ব, মুদ্রা ও সরবরাহব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর জন্য সাশ্রয়ী দামে পর্যাপ্ত খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কিছু সময় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হতে পারে। একইভাবে রাজস্বনীতি এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যেন সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে দুর্বল না করে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ, সংস্কারমুখী ও ব্যবসাবান্ধব বলে মনে করে। তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানিসংকট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে পুনর্জীবিত করতে সরকারের গৃহীত সংস্কারমুখী উদ্যোগ সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। 
সরকারি নীতিনির্ধারকদের মতে, আগামী দশকের অর্থনীতি সামনে রেখে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ এবং ‘ডিজিটাল ইকোনমি’ গড়ে তোলাই এ বাজেটের অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য। বিএনপির নেতারা মনে করেন, বিগত ১৭ বছরে অর্থনীতির যে স্থবিরতা ও আস্থার  সংকট তৈরি হয়েছিল, এই বাজেট তা কাটিয়ে ওঠার একটি কাঠামোগত রূপরেখা। বর্তমান সরকার এই বাজেটের মাধ্যমে তিনটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে–জনগণের কাছে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার, বিনিয়োগকারীদের কাছে স্থিতিশীলতার বার্তা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপরেখা উপস্থাপন। এদিকে মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখা ও সর্বোচ্চ আয়কর ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ হতাশাজনক বলে কেউ কেউ মনে করেন।

দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। এ অবস্থায় সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলেছে। পাশাপাশি বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজও দিয়েছে সরকার। সরকার প্রশাসনিক বাধা কমিয়ে বিনিয়োগের স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতির সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। 
দেশে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গত শনিবার ‘প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এর ওপর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের ভাবনা শীর্ষক সম্মেলনে বলা হয়েছে, খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে দশমিক ২ শতাংশ হারে কর কেটে রাখা হলে তা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে।

বাজেটোত্তর পর্যালোচনায় আমরা দেখেছি, বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে নানামুখী পদক্ষেপের কথা বলেছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মাথায় রেখে সরকারও নিত্যপণ্যের দাম কমাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে করছাড়ই যথেষ্ট নয়, সেই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলও সঠিকভাবে কার্যকর করতে হবে। অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করেও সরকারকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আশা করছি, সরকার মূল্যস্ফীতি কমাতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সক্ষম হবে।

নিঃসঙ্গ মৃত্যু বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক নিশ্চিত আশ্রয়

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক নিশ্চিত আশ্রয়

সম্প্রতি দেশে বেশ কিছু মৃত্যু নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে যে বিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টি করে তা হলো মিরপুরের ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মৃত্যু। তার সন্তানরা উচ্চশিক্ষিত হলেও তিনি জীবনের শেষ মুহূর্তে ছিলেন নিঃসঙ্গ। তার মৃত্যুর কয়েক দিন পরই একই এলাকার ৫৫ বছর বয়সী আফরোজা নামের আরেক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানও জীবনের শেষ মুহূর্তে ছিলেন নিঃসঙ্গ। মৃত্যুর পর কয়েক দিন ধরে বন্ধ ঘরে পড়ে থাকা কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার মরদেহ শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি সমাজের মূল্যবোধ ও মানবিকতার জন্য এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। এ ঘটনাগুলো শুধু কয়েকজন মানুষের মৃত্যুর গল্প নয়। এগুলো এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে, জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। 

দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৪ লাখেরও বেশি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দশকে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সাড়ে তিন থেকে চার কোটিরও বেশি হবে। তখন দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ থেকে ২২ শতাংশই হবেন প্রবীণ। আমাদের দেশে অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা একাকী জীবন কাটান। অনেক বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সন্তান বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু অনেকেই আছেন, যারা বাবা-মায়ের দায়িত্বে অবহেলা করেন। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের খোঁজ না রাখা যতটা অমানবিক ততটা সামাজিক অন্যায়ও। বিশ্বায়নের প্রভাবে নগরজীবনের যেমন ব্যস্ততা বাড়ছে, সেই সঙ্গে দায়িত্ববোধের ঘাটতি, সম্পর্কের দূরত্বও সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃদ্ধ বয়সে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল অর্থ নয়, দরকার মানসিক নিরাপত্তাও।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনজুমান আরা বলেন, আধুনিক সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জাপান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে ওল্ড হোম বা বৃদ্ধাশ্রম খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যবস্থা। আমাদের দেশেও এখন অনেক আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠছে। সন্তানরা কর্মজীবন বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতেই পারেন, সেটা অপরাধ নয়। তবে বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা চাকরিজীবনের শুরু থেকেই ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে পারেন। পেনশন বা আয়ের একটি অংশ প্রবীণ বয়সে নিরাপদ আবাসনের জন্য সঞ্চয় করা যেতে পারে। 

পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, আগামী বাংলাদেশ হবে বয়স্ক মানুষের বাংলাদেশ। সে কারণে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন-২০১৩ অনুযায়ী সক্ষম সন্তানদের বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে শাস্তির বিধানও রয়েছে। আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা চান না সন্তানরা শাস্তি পাক। তারা ভালোবাসার এক নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন। আমাদের বাব-মায়েরা নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে ডুবে না যাক, সন্তানদের কাছেই হোক তাদের শেষ আশ্রয়। আমরা সবাই চাই এমন এক মানবিক ও নিরাপদ সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে বৃদ্ধাশ্রম নয়, প্রত্যেক বাবা-মা তার সন্তানের কাছে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাবেন।

বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিন

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১২:১০ পিএম
কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিন

চুরি, সিস্টেম লস, অপচয়, দুর্নীতি এবং ব্যবস্থাপনাগত কারণে ভর্তুকিতে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা। এতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে রাষ্ট্রের। বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে টিকে আছে পুরো বিদ্যুৎ খাত। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, অবৈধ সংযোগ, মিটার কারসাজি এবং বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিদ্যুৎ খাত এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি, দোকানপাট, বাজার এবং অস্থায়ী স্থাপনায় সরাসরি বিদ্যুতের লাইন থেকে সংযোগ নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া মিটার টেম্পারিং, বাইপাস সংযোগ, বিলিং জালিয়াতি এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং স্টেশন থেকেও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে। অনুমোদনহীন এসব চার্জিং পয়েন্টে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হলেও কোনো বৈধ হিসাব থাকে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে অসাধু কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের কারসাজিতে হচ্ছে অনিয়ম-দুর্নীতি। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ওই সব অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভুতুড়ে বিল, মিটার জালিয়াতি, অবৈধ সংযোগ, সিস্টেম লসের নামে অনিয়ম এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কার্যকর জবাবদিহি ও শাস্তির নজির না থাকায় পরিস্থিতিরও তেমন উন্নতি হচ্ছে না। অন্যদিকে বছরের পর বছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হলেও খাতটির আর্থিকসংকট কাটছে না।

চলতি মাসে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ এবং  পাইকারি দাম ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। 
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বিদ্যুতের সিস্টেম লস সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশে তা ১০ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও বিতরণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো অবকাঠামো, দুর্বল ট্রান্সফরমার, জরাজীর্ণ লাইন এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে প্রযুক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি চুরি ও অনিয়ম মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের পেছনে বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তাদের চুরির কারণে সংকট কাটছে না বলে তিনি মনে করেন। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাত একটি অসাধু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের লাগামহীন দুর্নীতি ও চুরির কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এমন ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যারা ভোক্তাবিরোধী ও গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে বিচারের কোনো নজির নেই। বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতির কথা বলে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও বাস্তবে আর্থিক ঘাটতি কমছে না, বরং প্রতিদিনই তা বাড়ছে। সরকারের প্রধান দায়িত্ব জনগণকে সেবা দেওয়া, মুনাফা অর্জন নয়। তাই শুধু দাম বাড়ানোর নীতি অনুসরণ না করে সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিদ্যুতের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার উদ্যোগও প্রয়োজন।

বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিদ্যুৎ খাত বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এ জন্য সরকারকে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। চুরি, অপচয়, সিস্টেম লস ছাড়াও অব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি এ খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিদ্যুতের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে না থাকায় ভোক্তাদের ওপর এক ধরনের চাপ রয়েই গেছে। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর যেসব অসাধু কর্মকর্তা সিন্ডিকেট কারসাজিতে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আশা করছি, সরকার সাধারণ জনগণের স্বার্থে অতি দ্রুত লোকসান কমাতে পদক্ষেপ নেবে।

জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে জোর দিন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৪:২২ পিএম
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা

সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে জন-আকাঙ্ক্ষা অনেক। বর্তমান বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণে সরকার কতটা জন-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা নিয়ে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন। আগামী বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, জ্বালানিসংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দূর করার চাপ আছে। প্রত্যেক মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজেট করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা এবং রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা বাজেটে নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেটা কীভাবে সফল করা হবে, তা নির্ধারণ করে কার্যকর করা। গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন করা হয়। এরপর বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেন। এবার প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

এবারের বাজেটের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ হয়েছে গণতান্ত্রিক, মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘সীমিত সম্পদের মানুষকে স্বস্তি দিতেই এবারের বাজেট।’ প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তথ্যমতে, আগামী অর্থবছরের মোট দেশজ  উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

এবারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১০ বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো হলো সবার জন্য উন্নয়ন, মানসম্পন্ন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগনির্ভর কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি বিনিয়ন্ত্রণকরণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ, প্রযুক্তির বিকাশ, প্রকৃতি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ-দক্ষ জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

এখন নতুন সরকারের কাছে চাওয়া–প্রথম বাজেটে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী সরকার অর্থনীতির নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করবে। দেশে বেশ কিছু বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। তাই অবাস্তব ও অতি উচ্চাভিলাষী বাজেটের পরিবর্তে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে আগামী বাজেট হতে হবে জনবান্ধব। যদিও সরকার এবারের বাজেটে চাল, ডাল, লবণ, চিনি, হাঁস, মুরগি, তেলসহ ৬০টি পণ্যের দাম কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কখনোই শতভাগ বাজেট বাস্তবায়নের রেকর্ড নেই। বড় বাজেট ঘোষণা করা হলেও অনেক সময় দেখা যায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবছরই নানা ধরনের কাঠামোগত, আর্থিক ও প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়ে সরকার। তাই বছরের শুরু থেকেই আগামী বাজেট বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। বিভিন্ন খাতে যে বরাদ্দ থাকে, সেগুলো দেখা যায় বছরের শেষ দিকে অতিমাত্রায় বাস্তবায়নে তৎপরতা দেখানো হয়, ফলে কোনো কাজই সফলভাবে সম্পন্ন হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বরাদ্দের অর্থ ফেরত যায়। তাই আমরা আশা করব, বর্তমান সরকার বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বছরের তার থেকেই কাজ শুরু করবে। প্রথম বছর থেকেই যদি সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পালনের ব্যাপারে মনোযোগ দিতে পারে, তাহলে জনগণের মনে আশার সঞ্চার হবে। জনগণের আস্থা অর্জনই হোক সরকারের মূল লক্ষ্য।

বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট দর্শকদের প্রতি শুভকামনা থাকল

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম
দর্শকদের প্রতি শুভকামনা থাকল

বিশ্বকাপের কথা মনে পড়লেই দিকে দিকে রোমাঞ্চ জাগে। আজ বাংলাদেশ সময় রাত দেড়টায় বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধন হতে চলেছে। এটিই হচ্ছে আমাদের পৃথিবীর একক খেলাধুলার সবচেয়ে বড় আয়োজন। 
ফিফা বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের বিশালত্বই এর মহিমা। বিশ্বকাপের ২৩তম এই আসরে বেশ কিছু ‘প্রথম’ ঘটনা যুক্ত হতে যাচ্ছে। এই প্রথম কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে, অর্থাৎ সম্পূর্ণ একটি মহাদেশজুড়ে টুর্নামেন্টটি হবে। সম্প্রসারিত এই টুর্নামেন্টে ৩২টি দলের পরিবর্তে ৪৮টি দল অংশ নেবে। টুর্নামেন্টের সময়ও বাড়বে: এবারের আসরটি ৩৯ দিন স্থায়ী হবে। ১০৪টি ম্যাচ কানাডার দুটি, মেক্সিকোর তিনটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের এগারোটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। এই প্রথম পুরুষদের ফিফা বিশ্বকাপ কানাডায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

স্বাগতিক দেশ হিসেবে কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র টুর্নামেন্টে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের এবারই বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটবে। ২০২২ সালে নিজেদের তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এই টুর্নামেন্টে অংশ নেবে। দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় টুর্নামেন্টের কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। অংশগ্রহণ করা দলগুলো ৪টি করে মোট ১২টি গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলবে। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল এবং তৃতীয় স্থান অধিকারী সেরা ৮টি দল নিয়ে পরবর্তী ধাপে অনুষ্ঠিত হবে নতুন ‘রাউন্ড অব ৩২’ পর্ব। ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের নিউজার্সি (মেটলাইফ) স্টেডিয়ামে। ফিফা আশা করছে, পৃথিবীজুড়ে ৬ কোটি দর্শক, অর্থাৎ পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বিশ্বকাপ দেখবে। বৈশ্বিক এই আনন্দযজ্ঞের গভীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ গুরুত্ব রয়েছে।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রীড়া ইভেন্ট হিসেবে বৈশ্বিক ঐক্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের বিশাল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টটি প্রতি চার বছর পরপর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংহতি তৈরি করে। জাতীয় গৌরবের মাধ্যমে বিভিন্ন সম্প্রদায়, সংস্কৃতি, রাষ্ট্র ও অঞ্চলকে একত্রিত করে। টুর্নামেন্টটির আয়োজক শহর ও দেশগুলোর জন্য বয়ে আনে গৌরব। এতে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা, হসপিটালিটি সেক্টরের সম্প্রসারণ ঘটে। লাখ লাখ দর্শক আয়োজক অঞ্চলগুলোতে ভ্রমণ করেন, যা স্থানীয় বাজার, মিডিয়া শিল্প ও করপোরেট স্পনসরদের জন্য শতকোটি ডলারের অর্থনৈতিক চাঙাভাব তৈরি করে। 
এর কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। আয়োজক দেশগুলোকে বিশাল বিশ্বমঞ্চে তাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও বৈশ্বিক প্রভাব প্রদর্শনের সুযোগ করে দেয়। ফিফা সক্রিয়ভাবে এই টুর্নামেন্টকে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা প্রচারের কাজে লাগায়। শিক্ষার পক্ষে কথা বলতে এবং ক্ষুধা দূরীকরণের লক্ষ্যে তারা ইউনেসকো এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মতো সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে থাকে। সামাজিক দায়বদ্ধতা, বিশেষ করে মানবাধিকার এবং জলবায়ুসংক্রান্ত সমস্যা দূর করার প্রতিশ্রুতিও পালন করছে ফিফা।

বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। বিশ্বকাপে এখনো বাংলাদেশের অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়নি। তবে আমাদের অধিকাংশ দর্শক মূলত দুটি দেশের ‘ফ্যান’ বা সমর্থক; এর একটি আর্জেন্টিনা, অন্যটি ব্রাজিল। বিশ্বকাপ চলাকালে এ দেশের মানুষের আবেগ এই দুটি দেশকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। অন্য দলগুলোরও কমবেশি অনুরাগী রয়েছে, তবে তা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের পুরোটায় বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের চোখ যেমন টেলিভিশনের পর্দায় নিবদ্ধ থাকবে, তেমনি বাদ-প্রতিবাদ, বিজ্ঞের মতো চুলচেরা বিশ্লেষণও করতে দেখা যাবে অনেককে, বিশেষ করে তরুণদের। একই দলের সমর্থকরা এ সময় পরস্পরের মধ্যে যে ঐক্য অনুভব করেন তা অভূতপূর্ব। এ সময় সাধারণত দেখা গেছে, অপরাধ অনেক কমে যায়। সমাজে তুলনামূলকভাবে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় থাকে। অর্থনীতিও এ সময় চাঙা হয়ে ওঠে। তবে অনেক দুঃখজনক ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে। সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে অনেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েও মৃত্যুবরণ করেছেন।

খেলা আসলে খেলাই, আনন্দের উপলক্ষ মাত্র। এই আনন্দযজ্ঞে মর্মান্তিক বেদনাবিধুর এ রকম ঘটনা একেবারেই প্রত্যাশিত নয়। আমরা সবাইকে আহ্বান জানাব, আপনি যে দলের সমর্থক হন না কেন, ফলাফল মেনে নেবেন। জয়ের আতিশয্যে বা পরাজয়ে বিমর্ষ হয়ে নিজের জীবনকে বিপন্ন করবেন না। সব সময় সৌহার্দ্য বজায় রেখে খেলাকে উপভোগ করে এর মূল স্পিরিটকে অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি। মনে রাখবেন, খেলাধুলার চেয়ে জীবন অনেক বড়। খেলাধুলা আমাদের মধ্যে আনন্দের অনুভূতি সঞ্চার করে জীবনকে বর্ণিল করে তোলে। জীবনের এই জয়গান দিয়েই শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল। শুরুর প্রাক-মুহূর্তে বাংলাদেশের দর্শকদের প্রতি শুভকামনা থাকল।